দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে ছোট দেশ সুরিনামে (Suriname)-র রাজধানী পারামারিবো (Paramaribo)-তে কয়েক ঘণ্টার যাত্রাবিরতি ছিলো। সেখান থেকে নেদারল্যান্ডস-এর রয়েল ডাচ এয়ারলাইন্সের (KLM) বিশাল জাম্বোজেট 777-এ করে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমস্টারডামে নামবো। ওই মুহূর্তে যেখানে চলছিল মাইনাস ৭ ডিগ্রি তাপমাত্রা। তার মানে এর আগে দক্ষিণ আমেরিকার গরম যতখানি গায়ে মাখা যায় ততই সুখ… তাই সুরিনামে কিছুটা হলেও ঘুরতে চাই, যেহেতু খুবই ছোট্ট একটা দেশ। এই স্বপ্নেই বিভোর ছিলাম…

মাত্র ৬ লাখ ৩২ হাজার জনসংখ্যার দেশটির অর্ধেক মানুষই থাকেন রাজধানী শহরে পারামারিবো-তে। এটি আবার এই দেশের সবচেয়ে বড় শহরও বটে। তাই ভাবলাম কয়েক ঘণ্টায়ই হয়তো বেশ ভালোই একটা ঢুঁ মেরে ফেলতে পারবো। কিন্তু বিধিবাম! ইমিগ্রেশনের লম্বা লাইন লম্বা সময় নিয়ে নিলো। যতটুক দেখেছি ও শুনেছি, মানবপাচার প্রতিরোধের জন্যই এতোটা কড়াকড়ি তাদের। এমনকি এই দেশটাতে আপনি অন্য দেশের কোনও ধরনের খাবারদাবার, গাছের চারা, বীজ, ছোটখাটো পশুপাখি ইত্যাদিও নিয়ে যেতে গেলে পড়তে হবে নানান ঝামেলায়।
যা-ই হোক, যেহেতু সময় খুব কম তাই বাইরে যাওয়া রিস্কি হবে। আর বাইরে যেতে-আসতে গেলে আবারও ইমিগ্রেশনের সম্মুখীন হতে হবে। ইমিগ্রেশনের কালক্ষেপণ দেখে মনে হলো তারা USA-UK-Australia-Canada-Germany-এর চেয়েও কড়া! সময়ের স্বল্পতায় পরে ভাবলাম, ডিউটি-ফ্রি শপে একটু ঘোরাঘুরি করি। ঘুরতে ঘুরতে দেখি দেশটির কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি দোকান।
তাঁরা ফ্রেশ শাকসবজি বিক্রি করছে। দেখতে কেবল বাংলাদেশের মতোই নয়, মনে হচ্ছে বাংলাদেশেরই কোনও সুপারশপের পণ্য যেন। দেশি পুঁইশাক, কলমিশাক, ডাঁটাশাক, ঝিঙা, বরবটি, কচুপাতা, শসা— সবই আছে। দেশি শাকসবজি দেখলে আমার মাথা ঠিক থাকে না! আর যথারীতি এতো দূরের একটি দেশে আমাদের দেশি টাইপের শাকসবজি দেখে এবারও তা-ই হলো। তবে আমার কিন্তু চেক্ড-ইন লাগেজ নেই। তাহলে কীভাবে নেবো?
ছোট্ট হ্যান্ডলাগেজ আর ব্যাকপ্যাক নানানকিছু দিয়ে ভর্তি। দোকানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদেরকে সরকারি কর্মচারীই মনে হলো। বললাম, এগুলো তো দেখে এশিয়ান মনে হচ্ছে। এখানে কীভাবে এলো? তাঁরা জানালেন, এখানেই চাষ হয় সবজিগুলো, প্রচুর ভারতীয় মানুষ আছেন সুরিনামে-তে। ইনফ্যাক্ট, উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ৪২.৬ শতাংশ মানুষ এশিয়ান-সুরিনামিজ। মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১৪ শতাংশ।
যা-ই হোক, দোকানিদের বললাম শাকসবজি কিনতে চাই, তবে হাতে করে নিতে পারবো কী? কারণ আমার লাগেজে কোনও জায়গা নেই। তাঁরা জানালেন, তাঁরা অফিসিয়াল প্যাডে সবকিছু লিখে দিবেন, তাতে কোথাও কোনও সমস্যা হবে না।
শাকসবজির দামদর সবগুলোর গায়েই লেখা ছিল $100 SRD। ওজনে হয়তো ৪০০-৫০০-৬০০ গ্রামের হবে প্যাকেটগুলো। জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের $১০০ এসআরডি ইউএসডিতে কত? বললো $2.5 USD-এর একটু বেশি।
হিসেব করে দেখলাম, দাম জার্মানির কাছাকাছি বা কিছুটা কম। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, দেখে খুবই ফ্রেশ মনে হচ্ছে। কিন্ত পরক্ষণেই বাধ সাধল ক্যাশ টাকা। আমি বললাম আমার কাছে তোমাদের কোনও ডলার নেই। আছে ক্যাশ ইউরো অথবা ক্রেডিট কার্ড। কার্ডে পে করা যাবে?
হ্যাঁ যাবে! গ্রেট! দাও তাহলে। দেখতে দেখতে ৮ ধরনের শাকসবজি নিলাম। সব মিলিয়ে দাম আসলো $৮৮০ এসআরডি। $৮০ এসআরডি সম্ভবত ব্যাগের জন্য নিয়েছে। সবগুলো মিলিয়ে দাম হয়েছে $২৩ ইউএসডি বা ২০ ইউরোর মতো, যা বাংলা টাকায় দাঁড়ায় আজকের বাজারদর অনুযায়ী ২,৮০০ টাকা। ইউরোতে হিসেব করলে প্রতি প্যাকেট ২.৫€-এর মতো। যেটা ইউরোপের বাস্তবতায় খুবই রিজেনেবল একটা দাম।
দেশিজাতের জিনিস আরেক মহাদেশ থেকে কিনতে পেরে আমি বেজায় খুশি। ফ্লাইটে বসেই ফোনে গিন্নিকে জানালাম এই খুশির খবর, হাহহাহা। যাঁরা বিদেশে থাকেন তাঁরা জানেন যে এসব জিনিস কতটা দুর্লভ। দেশি জিনিস, বিশেষ করে শাকসবজি-ফলমূল কিনতে পারলে রীতিমতো ‘ইদের খুশি’ লাগে আমার কাছে!
এবারও এর ব্যতিক্রম হলো না। দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ থেকে ‘ইদের খুশি’ ব্যাগে ভরে নিয়ে ফিরে এলাম জার্মানিতে…

