মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের চার সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ। প্রতিদিন বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশ যে পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই সরু জলপথ এখন দুই হাজার জাহাজের এক বিশাল জটলায় পরিণত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক পাহারায় জাহাজ পার করার চেষ্টা করলেও তিনটি বিশেষ কারণে এই প্রণালিতে ইরানের পাল্লা এখনো অনেক ভারী।

১. অনন্য ভৌগোলিক সুবিধা ও ‘কিল জোন’
হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি মাত্র ২৪ মাইল চওড়া। আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে চলাচলের জন্য অত্যন্ত সরু শিপিং লেন ব্যবহার করতে হয়। বিশেষজ্ঞরা একে ‘চোকপয়েন্ট’ হিসেবে অভিহিত করেন। উন্মুক্ত সমুদ্রের মতো এখানে রুট পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই, যা ইরানের জন্য একটি আদর্শ ‘কিল জোন’ তৈরি করেছে। ইরানকে লক্ষ্যবস্তু খুঁজতে হয় না, কেবল অপেক্ষায় থাকলেই চলে। এছাড়া ইরানের এক হাজার মাইল দীর্ঘ পাহাড়ি উপকূলরেখা তাদের ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি লুকিয়ে রাখার জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রদান করে।
২. অপ্রচলিত যুদ্ধপদ্ধতি ও সস্তা সমরাস্ত্র
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রথাগত নৌ-শক্তি কমিয়ে দিলেও দেশটির অপ্রচলিত সমরাস্ত্র এখন প্রধান হুমকি।
- সস্তা ড্রোন ও মাইন: সাধারণ পালতোলা নৌকা থেকেও ইরান মাইন পাততে সক্ষম, যা শনাক্ত করা কঠিন।
- দ্রুতগামী নৌযান: বিস্ফোরক বোঝাই ছোট ছোট মনুষ্যবিহীন নৌযান বড় যুদ্ধজাহাজের জন্য বড় আতঙ্ক।
- ক্ষুদ্র সাবমেরিন: অগভীর পানিতে চলাচলকারী ‘মিজেট সাবমেরিন’গুলো মার্কিন রাডার ফাঁকি দিয়ে হামলা চালাতে সক্ষম।
৩. অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও ‘নিরাপদ পারাপার’ ফি
এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য কেবল সামরিক নয়, বরং কৌশলগতভাবে লাভজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ‘লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স’-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, কিছু জাহাজ নিরাপদে পার হওয়ার বিনিময়ে ইরানকে মোটা অঙ্কের অর্থ বা ‘টোল’ পরিশোধ করছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, নির্দিষ্ট শর্ত ও ফি’র বিনিময়ে তারা এই পারাপার অব্যাহত রাখবে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এক নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে।
হরমুজ প্রণালি কেবল একটি ভৌগোলিক রেখা নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি। ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান এবং অপ্রচলিত সমরকৌশল দেশটিকে এই সরু পথে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সামরিক পাহারার কথা বললেও, এই ‘চোকপয়েন্টে’ ইরানের কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব মোকাবিলা করা বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

