ভারতের অর্থনীতিতে বিলিয়নিয়ারদের দাপট এখন আকাশচুম্বী। ফোর্বসের ২০২৬ সালের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, ভারতে শতকোটিপতির সংখ্যা রেকর্ড ২২৯-এ পৌঁছেছে। শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা আর নতুন নতুন কোম্পানির অন্তর্ভুক্তিতে ভারতের শীর্ষ ধনীদের সম্মিলিত সম্পদ এখন এক ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এই বিশাল সাম্রাজ্যের শীর্ষে বরাবরের মতোই নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন রিলায়েন্স কর্তা মুকেশ আম্বানি।

১ মার্চের তথ্যের ভিত্তিতে ভারতের শীর্ষ ১০ ধনীর তালিকা ও তাঁদের সম্পদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. মুকেশ আম্বানি (রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ)
সম্পদ: ৯৯.৭ বিলিয়ন ডলার।
ভারতের তথা এশিয়ার শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানি। তাঁর রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ বর্তমানে পেট্রোকেমিক্যাল, টেলিকম (জিও) এবং খুচরা বাণিজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আছে।
২. গৌতম আদানি (আদানি গ্রুপ)
সম্পদ: ৬৩.৮ বিলিয়ন ডলার।
অবকাঠামো খাতের জাদুকর গৌতম আদানি। বন্দর, বিদ্যুৎ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে তাঁর বিশাল বিনিয়োগ আদানি গ্রুপকে ভারতের অর্থনৈতিক স্তম্ভে পরিণত করেছে।
৩. সাবিত্রী জিন্দাল (জিন্দাল গ্রুপ)
সম্পদ: ৩৯.১ বিলিয়ন ডলার।
ভারতের শীর্ষ ১০-এর তালিকায় থাকা একমাত্র নারী উদ্যোক্তা। ও পি জিন্দালের মৃত্যুর পর চার ছেলের মাধ্যমে ইস্পাত খাতের এই বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন তিনি।
৪. লক্ষ্মী মিত্তাল (আর্কেলর মিত্তাল)
সম্পদ: উভয়েরই ২৫.৬ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্বের বৃহত্তম ইস্পাত ও খনন কোম্পানি আর্কেলর মিত্তালের চেয়ারম্যান লক্ষ্মী মিত্তাল। তাঁর পরিবারেরও ইস্পাত ব্যবসা ছিল। তিনি প্রথমে মিত্তাল স্টিল প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ২০০৬ সালে ফ্রান্সের আর্কেলরের সঙ্গে কোম্পানিটি একীভূত করেন। ২০২৫ সালে আর্কেলরমিত্তালের নিট আয় ছিল ৩১৫ কোটি ডলার। ২০২৪ সালে যা ছিল ১৩০ কোটি ডলার। ২০১৯ সালে আর্কেলর ও নিপ্পন স্টিল ৫৯০ কোটি ডলারে এসার স্টিল অধিগ্রহণ করে। ২০২১ সালে তিনি প্রধান নির্বাহী পদ ছেড়ে দেন। তাঁর জায়গায় আসেন কন্যা আদিত্য মিত্তাল। তবে তিনি কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন।
৫. শিব নাদার (এইচসিএল টেকনোলজিস)
সম্পদ: ৩০.৯ বিলিয়ন ডলার।
ভারতের আইটি সেক্টরের অন্যতম কিংবদন্তি। বর্তমানে তিনি ইমেরিটাস চেয়ারম্যান হিসেবে থাকলেও তাঁর কন্যা রোশনি নাদার প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেছেন।
৬. সাইরাস পুনাওয়ালা (সিরাম ইনস্টিটিউট)
সম্পদ: ২৭ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্বের বৃহত্তম টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিরাম ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা। কোভিড টিকা উৎপাদনের মাধ্যমে তাঁর প্রতিষ্ঠান বিশ্বজুড়ে খ্যাতি ও সম্পদ কুড়িয়েছে।
৭. দিলীপ সাংভি
সম্পদ: ২৫.৬ বিলিয়ন ডলার, খাত: ওষুধ
ভারতের শীর্ষ ওষুধ উদ্যোক্তাদের একজন দিলীপ সাংভি। তাঁর বাবা ছিলেন ওষুধ পরিবেশক। ১৯৮৩ সালে বাবার কাছ থেকে মাত্র ২০০ ডলার ধার নিয়ে সান ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। শুরুতে মানসিক রোগের ওষুধ তৈরি করলেও কোম্পানিটি পরবর্তীকালে দ্রুত বিস্তৃত হয়। বর্তমানে এটি ভারতের সবচেয়ে দামি তালিকাভুক্ত ওষুধ কোম্পানি। তাদের আয়ের বড় অংশই আসে বিদেশের বাজার থেকে। ছোট বিভিন্ন কোম্পানি অধিগ্রহণের মাধ্যমে সান ফার্মা বড় হয়েছে। ২০১৪ সালে র্যানব্যাক্সি ল্যাবরেটরিজ কিনে নেয় তারা। এটি ছিল সবচেয়ে বড় অধিগ্রহণ। সম্প্রতি দিলীপের ছেলে অলোক সাংভি প্রতিষ্ঠানের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা হয়েছেন।
৮. কুমার বিড়লা (আদিত্য বিড়লা গ্রুপ)
সম্পদ: ২১.১ বিলিয়ন ডলার।
সিমেন্ট থেকে টেলিকম, নানা খাতে বিস্তৃত আদিত্য বিড়লা গ্রুপের চতুর্থ প্রজন্মের প্রধান কুমার মঙ্গলম বিড়লা তাঁর পৈতৃক ব্যবসাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
৯. রাধাকিষান দামানি (অ্যাভিনিউ সুপারমার্টস)
সম্পদ: ১৫.৭ বিলিয়ন ডলার।
খুচরা বাণিজ্যের রাজা হিসেবে পরিচিত দামানি। তাঁর ডি-মার্ট (D-Mart) চেইন সুপারমার্কেট ভারতের মধ্যবিত্ত মানুষের পছন্দের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে।
১০. উদয় কোটাক (কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাংক)
সম্পদ: ১৪.৪ বিলিয়ন ডলার।
ব্যাংকিং খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব উদয় কোটাক। তাঁর হাত ধরেই কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাংক ভারতের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংকে পরিণত হয়েছে।
উপসংহার
ভারতের এই শীর্ষ ১০ ধনীর সম্মিলিত সম্পদ কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এটি ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিফলন। মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানিদের মতো উদ্যোক্তাদের হাত ধরে ভারত এখন বিশ্ব অর্থনীতির মঞ্চে এক ট্রিলিয়ন ডলারের ক্লাবে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করছে। শেয়ারবাজারের চড়াই-উতরাই সত্ত্বেও এই বিলিয়নিয়ারদের সাম্রাজ্য ভারতের অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে নতুন দিশা দেখাচ্ছে।

