বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পবিত্র রমজান মাসকে ঘিরে রয়েছে বৈচিত্র্যময় সব প্রথা ও সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিগুলো শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং এক একটি দেশের হাজার বছরের ঐতিহ্যের অংশ। পবিত্র রমজান মাস শুধু সংযম বা ত্যাগের মাস নয়, এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মুসলিম উম্মাহর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির এক মিলনমেলা। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে সুদূর সেনেগাল- প্রতিটি জনপদ রমজানকে বরণ করে নেয় তাদের নিজস্ব ঢঙে। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা জানব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রমজানের হারিয়ে যাওয়া ও টিকে থাকা কিছু চমৎকার প্রথা সম্পর্কে।

পুরান ঢাকার ঐতিহ্য : কাসিদা
এক সময় পুরান ঢাকার রমজান মানেই ছিল রাতের শেষ প্রহরে দলবেঁধে গাওয়া কাসিদা। আরবি শব্দ ‘কাসিদা’র অর্থ প্রশংসা। মোগল আমলে শুরু হওয়া এই প্রথায় সাহ্রির সময় রোজাদারদের ঘুম ভাঙানোর জন্য প্রশংসামূলক কবিতা বা গান গাওয়া হতো। যদিও আধুনিক যুগে মোবাইল আর ইন্টারনেটের ভিড়ে এই মধুর সুর এখন আর আগের মতো শোনা যায় না।
সাহার খান ও মুনাদি : কাশ্মীর ও দিল্লি
সাহ্রির সময় ঘুম ভাঙানোর রেওয়াজ আছে কাশ্মীর এবং দিল্লিতেও। কাশ্মীরে যারা বাজনার তালে তালে ‘ওয়াক্ত-ই-সাহার’ বলে ডাকেন, তাদের বলা হয় ‘সাহার খান’। অন্যদিকে দিল্লির পুরোনো অংশে যারা একই কাজ করেন, তাদের বলা হয় ‘মুনাদি’। কুর্তা, পাজামা ও টুপি পরা এই মানুষগুলো মোগল আমলের এক জীবন্ত স্মৃতি হিসেবে টিকে আছেন।
কামানের তোপধ্বনিতে ইফতার : মিসর
মিসরের কায়রোতে ইফতারের সময় জানানো হয় কামান দেগে। এর পেছনে রয়েছে ১৫ শতকের মামলুক সুলতানের এক মজার কাহিনী। ভুলে কামান দাগার শব্দে কায়রোবাসী যখন ইফতার করে ফেলেন, তখন থেকেই এটি প্রথায় পরিণত হয়। পরবর্তীতে এই প্রথা সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান এবং তুরস্কসহ বিভিন্ন আরব দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
ফানুস ও লন্ঠনের সাজ : আরব বিশ্ব
রমজানকে সাজসজ্জার মাধ্যমে বরণ করার রেওয়াজ অনেক পুরনো। বিশেষ করে মিসরের কায়রোতে দোকান ও ঘরবাড়ি সাজানো হয় বিশেষ ধরণের লন্ঠন দিয়ে। ফিলিস্তিনের গাজাতেও শত কষ্টের মাঝে লন্ঠনের আলোয় রমজান উদযাপিত হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার বা কুয়েতে আবার চাঁদ-তারার নকশা আর আধুনিক আলোর কারুকাজ নজর কাড়ে সবার।
আতিথেয়তার সংস্কৃতি : সেনেগালের ‘তেরাঙ্গা’
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সেনেগালের মানুষের মাঝে রমজানে ‘তেরাঙ্গা’ সংস্কৃতির চর্চা বেড়ে যায়। তেরাঙ্গা মানে হলো আতিথেয়তা। দেশটিতে ইফতারকে বলা হয় ‘এনদোগোউ’। সেনেগালবাসীর আপ্রাণ চেষ্টা থাকে যেন এলাকার একজন মানুষও ইফতার থেকে বঞ্চিত না হয়। তাদের এই সম্প্রীতি রমজানের প্রকৃত তাৎপর্যকে ফুটিয়ে তোলে।
উপসংহার : রমজানের মূল সুর একই
দেশ ও ভাষা ভিন্ন হলেও রমজানের মূল সুরটি কিন্তু একই। তা হলো শান্তি, সংহতি এবং সহমর্মিতা। এই ঐতিহ্যগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা একেকজন একেকভাবে রমজান পালন করলেও আমাদের উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। এই সমৃদ্ধ সংস্কৃতিগুলোই রমজানকে করে তোলে আরও মহিমান্বিত।

