যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় গত শনিবার রাতে নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ৮৬ বছর বয়সে তাঁর এই প্রয়াণ কেবল ইরানের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্ব রাজনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা। ১৯৮৯ সাল থেকে দীর্ঘ ৩৭ বছর তিনি ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।

আয়াতুল্লাহ খামেনি : বিপ্লব থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা
১৯৩৯ সালে পবিত্র মাশহাদ নগরীতে জন্ম নেওয়া খামেনি ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন ডানপিটে ও বিপ্লবী। তাঁর বাবা একজন খ্যাতনামা আলেম হলেও খামেনিকে রাজনীতিতে টেনে এনেছিল পাহলভি রাজতন্ত্রের অত্যাচার। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির শিষ্য হিসেবে তিনি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
বিপ্লবের পর তিনি উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ইরানের প্রেসিডেন্ট (১৯৮১-১৯৮৯) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ তাঁকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। যদিও সে সময় তাঁর ধর্মীয় পদবি নিয়ে বিতর্ক ছিল, তবুও সংবিধান সংশোধন করে তাঁকে এই পদে বসানো হয়।
সামরিক শক্তি ও ‘প্রতিরোধ অক্ষ’
খামেনি বিশ্বাস করতেন, ইরানকে টিকে থাকতে হলে কেবল দেশের ভেতরে নয়, বরং সীমানার বাইরেও প্রভাব বিস্তার করতে হবে। তাঁর এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’।
- আইআরজিসি (IRGC): তিনি ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীকে একটি সাধারণ মিলিশিয়া থেকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেন।
- আঞ্চলিক প্রভাব: লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং গাজার হামাসকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করার মাধ্যমে তিনি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেছিলেন। এই কৌশলের প্রধান কারিগর ছিলেন জেনারেল কাসেম সোলাইমানি, যাকে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করে।
‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ ও পশ্চিমা অবিশ্বাস
খামেনির শাসনের অন্যতম ভিত্তি ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি চরম অবিশ্বাস। ১৯৮০-এর দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় পশ্চিমাদের ইরাকপ্রীতি তাঁকে শিখিয়েছিল যে ইরানকে একাই লড়তে হবে। এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’-র ধারণা দেন, যাতে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান স্বনির্ভর থাকতে পারে।
২০১৫ সালে তিনি পারমাণবিক চুক্তিতে সায় দিলেও ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে সরে আসার পর খামেনি আবার তাঁর হার্ডলাইন অবস্থানে ফিরে যান।
অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ ও দমননীতি
খামেনির দীর্ঘ শাসনামল সবসময় মসৃণ ছিল না। বিভিন্ন সময় তিনি তীব্র জনরোষের মুখে পড়েছেন:
১. ২০০৯ সালের সবুজ আন্দোলন: নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগে ওঠা বিক্ষোভ তিনি কঠোর হাতে দমন করেন।
২. ২০২২ সালের হিজাব আন্দোলন: মাসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলন দমনেও তিনি ছিলেন আপসহীন।
৩. ২০২৫-২৬ সালের অর্থনৈতিক বিক্ষোভ: মুদ্রাস্ফীতি ও রিয়ালের দরপতন নিয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরান আবার উত্তাল হয়ে ওঠে, যা ছিল তাঁর জীবনের শেষ বড় চ্যালেঞ্জ।
উপসংহার : এখন কোন পথে যাবে ইরান
আলী খামেনি কেবল একজন ধর্মীয় নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন বাস্তববাদী এবং অত্যন্ত কৌশলী রাষ্ট্রনায়ক। তিনি এমন এক ইরান রেখে গেলেন যা সামরিক দিক থেকে অপরাজেয় হওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নানা সংকটে জর্জরিত। তাঁর প্রয়াণের পর ইরান কি আবার সংস্কারের পথে হাঁটবে, নাকি কট্টরপন্থা আরও বাড়বে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

