মীর আব্দুল আলীম ও মোশাররফ হোসেন মুসা :: এক কথায় স্থানীয় কাজ করার জন্য যে সরকার তাকে ‘স্থানীয় সরকার’ এবং জাতীয় ও বৈদেশিক কাজ করার জন্য যে সরকার তাকে ‘কেন্দ্রীয়’ অথবা ‘জাতীয় সরকার’ বলে। এদেশে একটি মাত্র সরকার ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে। সেটাও অত্যন্ত কেন্দ্রিভূত। স্থানীয় সরকার নামে আলাদা কোনো সরকার ব্যবস্থা নেই। একই কারনে সকলে স্থানীয় সরকারের কাজকে কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ মনে করে স্থানীয় প্রতিনিধিদের মূল্যয়ন করে থাকেন। সকলের জানা রয়েছে, সমগ্র জনগোষ্ঠী কোনো না কোনো স্থানীয় ইউনিটে বসবাস করে। তাছাড়া এদেশের জনগণ দীর্ঘকাল থেকে স্থানীয়তা,আঞ্চলিকতা ও আত্মীয়তার বন্ধনে বসবাস করে আসছে। কিন্তু বর্তমানে সকল ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় জাতীয় রাজনীতির প্রভাব পড়ায় এখন তারা বহুধা বিভক্ত। চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ে সেটাই প্রমাণিত হয়েছে।
রাজনীতি হলো দেশ ও জনগণের উন্নয়নে নানারকম চিন্তার সমষ্টি। আর রাজনৈতিক দল হলো একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ কিংবা কতগুলো কর্মসূচী বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে জনগণের একটি ঐক্যবদ্ধ অংশ। সেজন্য বর্তমানে রাজনৈতিক দলবিহীন কোনো রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়না। আমাদের আরও জানা রয়েছে, দেশের কোন উন্নয়ন চিন্তাই রাজনীতির বাইরে নয়। তবে দেশের উন্নয়ন করতে হলে একটি রাজনৈতিক দলে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু বার বার পরাধীনতা এবং বার বার বিদেশি শক্তি ও স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন আমাদেরকে অতিমাত্রায় ‘জাতীয়’ করে ফেলেছে। ফলে দলনিরপেক্ষ অবস্থান থেকে দেশের উন্নয়ন কাজে অংশগ্রহণ করার পরিসরটি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বে এর বিপরীত চিত্র পরিলক্ষিত হয়। সেখানে সর্বত্র গণতান্ত্রিক রীতি-নীতির প্রাতিষ্ঠানিকতা থাকায় সকলকে জাতীয় রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। সেখানে উন্নয়ন কর্মকা-ও নীচের থেকে উপরমুখী (বটম-আপ) পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। স্থানীয়রা দলীয় ও নির্দলীয় অবস্থান থেকে স্থানীয় উন্নয়নে অংশগ্রহণ করে নাগরিক দায়িত্ব পালন করে থাকেন। স্থানীয় সরকারগুলো স্বশাসিত থাকে এবং নিজস্ব অর্থে উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা করে স্বশাসনের সার্থকতা বজায় রাখার চেষ্টা করে। আমাদের দেশেও একসময় স্থানীয় জনগণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে রাস্তা-ঘাট ও পুল-কালভার্ট এবং চাঁদা তুলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতেন। স্থানীয়রাও প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ত্যাগী ও উদ্যমী ব্যক্তিদের গুরুত্ব দিতেন। এ নিয়ম বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। স্বাধীন দেশে স্থানীয় সরকারের হাতে আরও ক্ষমতা দেওয়ার পরিবর্তে, তথা সেগুলোকে আরও গণতান্ত্রিক করার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকারের এজেন্ট করে রাখার নিয়ম চালু হয়। স্বৈরাচারী শাসকরা স্থানীয় সরকারকে ব্যবহার করে নতুন নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টা করে। ফলে স্থানীয় সরকারগুলো নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। স্থানীয় প্রতিনিধিরা মুখে স্বায়ত্তশাসনের দাবী করেন বটে, বাস্তবে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে কে কত অর্থ আদায় করতে পারেন সে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকেন। সে কারণে স্থানীয় উন্নয়নে কে কতটুকু ভূমিকা রেখেছেন সে বিবেচনায় স্থানীয়রা আর ভোট দিচ্ছেন না। সেজন্য বলা উচিত, চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ফল বিপর্যয়ে দলীয় প্রার্থীরা দায়ী নন। এটি অগণতান্ত্রিক জাতীয় রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে মাত্র।
আমাদের দেশে সমস্ত কাজ ও দায়িত্বকে দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়, তাহলো জাতীয় ও স্থানীয়। সেজন্য দুই প্রকারের সরকারই বাস্তবায়নযোগ্য। সে ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোতেও দুই প্রকারের কমিটি থাকবে। তাদের কক্ষপথও থাকবে ভিন্ন ভিন্ন। জাতীয় কমিটি বিদেশ নীতি, জাতীয় রাজনীতি, কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই ইত্যাদি কাজ সহ গোটা দেশ ভিত্তিক কাজে মনোযোগ দেবে বেশি। অপরদিকে স্থানীয় কমিটির জন্য স্থানীয় উন্নয়ন চিন্তা, স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই ইত্যাদি কাজ নির্দিষ্ট থাকবে (যেমন- গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থী কে হবেন তা বাছাই করবে সেখানকার স্থানীয় কমিটিগুলো। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো ভূমিকা থাকবে না)। এ নিয়ম চালু হলে স্থানীয়রা তাদের স্থানীয়তা বজায় রেখে পূর্ণ নাগরিক হয়ে ওঠার সুযোগ পাবেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ জাতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাবেন। সেরকম ব্যবস্থায় রাজনীতিতে ‘জাতীয়’ চিন্তা বর্তমানের মতো অসহনীয় অবস্থায় থাকবে না এবং তার খেসারতও স্থানীয় প্রতিনিধিদের দিতে হবে না।
লেখকদ্বয় : গবেষক ও কলাম লেখক
মন্তব্য যুক্ত করুন
