বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপটে এখন পরিবর্তনের মহোৎসব। নির্বাচনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্ষমতায় ফেরার পর সবার দৃষ্টি এখন একজনের দিকেই, তিনি তারেক রহমান। তবে এবারের লড়াইটা কেবল ভোটের মাঠে জয়ের ছিল না, বরং সামনের লড়াইটি হলো একটি ক্ষতবিক্ষত রাষ্ট্রকে মেরামত করার। জনআকাঙ্ক্ষার যে জোয়ারে তিনি আজ ক্ষমতার শীর্ষে, সেই জোয়ারকে উন্নয়ন আর সুশাসনে রূপান্তর করাই এখন তার প্রধান লক্ষ্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, তারেক রহমানের সামনে এখন শুধু ‘দলের নেতা’ হয়ে থাকার সুযোগ নেই; বরং সময় এসেছে নিজেকে একজন বিশ্বমানের ‘স্টেটসম্যান’ বা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার। কিন্তু এই কণ্টকাকীর্ণ পথ কি তিনি সফলভাবে পাড়ি দিতে পারবেন?
অতীত বনাম বর্তমান: মুক্তিযুদ্ধের মূলচেতনায় প্রত্যাবর্তন
তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে এবার ‘ঘটমান বর্তমান’ এবং ‘অতীতের শিকড়’ – দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটেছে। দেশের জন্মলগ্নের সেই রক্তাক্ত ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির যে গণজোয়ার এবার দেখা গেছে, তাকে ধারণ করাই হবে নতুন সরকারের বড় শক্তি।
ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে একটি অসাম্প্রদায়িক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই তিনি গতানুগতিক রাজনীতির উর্ধ্বে উঠতে পারেন।

বাধার বিন্ধ্যাচল: অর্থনীতির সংস্কার ও সুশাসন
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখন কোনো দিক দিয়েই খুব একটা স্বস্তিকর অবস্থায় নেই। আদর্শিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক, প্রতিটি ক্ষেত্রে যে ফাটল ধরেছে, তা মেরামত করা চাট্টিখানি কথা নয়। নির্বাচনের আগে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ, কিন্তু ক্ষমতার চেয়ারে বসে সেই ‘বাধার বিন্ধ্যাচল’ পাড়ি দেওয়াই হলো আসল চ্যালেঞ্জ।
ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার
বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা ফেরানো এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে দ্রব্যমূল্য নিয়ে আসা হবে তার প্রথম অগ্নিপরীক্ষা। জনগণের ‘মেজরিটি পার্টির নেতা’ হিসেবে তিনি এই সংকট কীভাবে মোকাবিলা করেন, তা দেখতে মুখিয়ে আছে দেশবাসী।
শাসনতান্ত্রিক সংস্কার ও বিচারহীনতা দূর
মানুষ কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন চায়নি, চেয়েছে ব্যবস্থার পরিবর্তন। পুলিশ, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানোই হবে ‘স্টেটসম্যান’ সুলভ কাজ।
নেতার চেয়েও বড় প্রয়োজন একজন ‘ত্রাতা’
বর্তমানে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক যে পরিস্থিতি, সেখানে মানুষের কেবল একজন প্রধানমন্ত্রীর প্রয়োজন নেই; বরং এমন একজন ‘ত্রাতা’ প্রয়োজন যিনি বিভাজিত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করবেন। তারেক রহমান কি হয়ে উঠতে পারবেন সেই ত্রাতা? তার ত্রাতা হয়ে ওঠা ছাড়া আর কোনো উপায়ান্তর নেই। কিন্তু অগ্রাধিকারের তালিকায় তিনি কোনটিকে আগে রাখবেন, রাজনৈতিক প্রতিশোধ নাকি জাতীয় সংস্কার? এই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং ইতিহাসের পাতায় তার অবস্থান।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আগামীর রূপরেখা
বিদেশের মাটিতে দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে তারেক রহমান যখন রাষ্ট্র পরিচালনার ভার নিচ্ছেন, তখন বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণও বেশ জটিল। প্রতিবেশি দেশসহ বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করাই হবে তার কূটনীতির বড় পরীক্ষা।
উপসংহার: সুযোগ এসেছে ইতিহাস গড়ার
তারেক রহমানের সামনে আজ যে সুযোগ এসেছে, তা খুব কম রাজনীতিকের ভাগ্যেই জোটে। তিনি কি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী এক আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে পারবেন? যদি তিনি সংকীর্ণ রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করতে পারেন, তবেই তিনি প্রকৃত ‘স্টেটসম্যান’ হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন। দেশের মানুষ এখন এক নতুন ভোরের অপেক্ষায়, যেখানে নেতা নয়—একজন রাষ্ট্রনায়কের ছায়াতলে তারা নিরাপদ বোধ করবে।

