গত বছর আমি সুন্দরবনের কাছে একটি গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানে লোনা পানির কথা শুনেছিলাম। ফসলি জমি নষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় আর বন্যার তীব্রতা বাড়ছে। উপকূলীয় মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে। আমাদের দেশ নতুন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কৌশল নিয়ে কাজ করছে। সরকার জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচি শুরু করেছে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড তৈরি করেছে ২০১০ সালে। এই ফান্ড থেকে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। আমি জানি যে উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি এখন আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান চিত্র এবং চ্যালেঞ্জসমূহ
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যার সম্মুখীন, যা প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। প্রতি বছরই ভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশগত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় এলাকা ডুবিয়ে দিচ্ছে, ফলে হাজারো মানুষ বাসস্থান হারাচ্ছে এবং কৃষিজমি লবণাক্ত হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণে হঠাৎ বন্যা বা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এসব প্রভাব শুধু গ্রামীণ জনপদে সীমাবদ্ধ নয়, বরং শহুরে অবকাঠামো, অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন বাংলাদেশের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল সংকটে পরিণত হয়েছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকি
বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের উপকূলে সমুদ্রের পানি প্রতি বছর গড়ে ৩ থেকে ৮ মিলিমিটার হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উপকূলীয় এলাকার জন্য মারাত্মক হুমকি। এই পানি বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় বাঁধ ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামো ক্রমেই ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
কক্সবাজার, সাতক্ষীরা এবং বরগুনার মতো জেলাগুলোতে লবণাক্ততা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে, যার প্রভাবে কৃষিজমির উর্বরতা কমছে এবং সুপেয় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। এর পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবিকা, বিশেষ করে কৃষি ও মৎস্য খাত, ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যাও বাড়িয়ে তুলছে।
বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা
২০২২ এবং ২০২৩ সালের ভয়াবহ বন্যা আমাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। বিশেষ করে সিলেট ও সুনামগঞ্জে এই সময়ে রেকর্ড পরিমাণ পানি বৃদ্ধি পেয়েছিল, যার ফলে হাজারো পরিবার গৃহহীন হয় এবং অবকাঠামো, ফসল ও পশুপালনে ব্যাপক ক্ষতি হয়।
এই অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দেশের বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। নদীর তীর সংরক্ষণ, সঠিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত, এবং আধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশকে বন্যা ব্যবস্থাপনায় আরও প্রস্তুত ও প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে।
গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ এবং পরিবেশগত প্রভাব
পরিবেশ অধিদপ্তর বলেছে, বাংলাদেশ প্রতি বছর ৪০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত করে। গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে। শিল্প কারখানা এবং যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ুকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি
বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশজুড়ে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একটি তহবিল থেকে এখনও পর্যন্ত ৪৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এই তহবিল থেকে প্রায় ৮০০টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। ৫৫০ কিলোমিটার নতুন বাঁধ তৈরি করা হচ্ছে। এই বাঁধগুলো উপকূলীয় এলাকার মানুষদের সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করবে।

পাশাপাশি কৃষি জমি ও বসতবাড়ি সুরক্ষিত থাকবে। আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের অগ্রগতি খুবই আশাব্যঞ্জক। সারাদেশে প্রায় ৪,০০০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।
এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় লাখো মানুষের জীবন রক্ষা করছে। প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সরকার জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা ২০২২-২০৪১ প্রণয়ন করেছে। এই পরিকল্পনায় জলবায়ু অভিযোজন কৌশল বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আমি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখছি। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সবুজ প্রযুক্তি বাংলাদেশ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে।
সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের অগ্রগতি
আমি দেখছি কক্সবাজারের টেকনাফে ২৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌর বিদ্যুৎ পার্ক চালু হয়েছে। পটুয়াখালীর পায়রায় ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এসব নবায়নযোগ্য জ্বালানি উদ্যোগ দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির প্রসার
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর লবণ সহনশীল ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে। বিআর২৩ এবং বিআর৪৭ জাতের ধান উপকূলীয় এলাকায় চাষ করা হচ্ছে। জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বনায়ন কর্মসূচি এবং সবুজায়ন উদ্যোগ
সুন্দরবন সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় ৫ কোটি চারা রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশব্যাপী বনায়ন কর্মসূচি চলছে। এসব নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্প পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়ক হচ্ছে।
শেষকথা
জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যায় বাংলাদেশ প্রস্তুত। ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এবং ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান দেশকে দিকনির্দেশ দিচ্ছে। সরকার সৌর বিদ্যুৎ এবং উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণে বিনিয়োগ করছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের নেতৃত্ব দিচ্ছে। নেট জিরো কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্য রেখে কাজ করছে বাংলাদেশ। আমি বিশ্বাস করি এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা এটি করতে পারি।
জলবায়ু পরিবর্তনের যুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার এবং বেসরকারি খাত সক্রিয়। সাধারণ মানুষও এই যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ সফল হবে বলে আমার বিশ্বাস।

