বছরের শুরুতে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আর নতুন ক্লাসে ওঠার আনন্দ ছাপিয়ে অভিভাবকদের মনে এখন একটিই বিষণ্ণ সুর, ‘পুনর্ভর্তি ফি’। সন্তান একই প্রতিষ্ঠানে পড়ছে, একই বেঞ্চে বসবে, অথচ বছর ঘুরলেই নতুন করে হাজার হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। এটি কেবল একটি ফি নয়, বরং মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত অভিভাবকদের জন্য বার্ষিক এক আতঙ্কের নাম। গত ৯ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করে এই ফি আদায় নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অতীতেও এমন অসংখ্য নিষেধাজ্ঞা কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল; এবার কি তবে সত্যিই মিলবে মুক্তি?
নতুন নীতিমালার ঘোষণা : কী আছে এতে?
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা এই নীতিমালায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—কোনো প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কোনোভাবেই পুনর্ভর্তি ফি নেওয়া যাবে না। শুধু ২০২৪ সালের নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত বেতন ও সেশন চার্জ নেওয়া যাবে। সচিব রেহানা পারভীনের সই করা এই নির্দেশনায় টিউশন ফি থেকে শুরু করে সব ধরণের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা আগেও ছিল, বাস্তবায়ন কই?
ইতিহাস বলছে, নিয়ম ভাঙাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের নভেম্বরেও একই ধরণের নির্দেশনা দিয়েছিল সরকার। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। ব্যানবেইস-এর ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের পকেট কাটছে এক শ্রেণির অসাধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরাসরি পুনর্ভর্তি ফি না বলে তারা ‘উন্নয়ন ফি’, ‘আইপিএস ফি’ বা ‘স্কাউট ফি’-র মতো বিচিত্র সব নাম দিয়ে টাকা আদায় করছে।
‘উন্নয়ন ফি’ না কি পকেট কাটার ফাঁদ?
রাজধানীর এক অভিভাবক টিপু সুলতানের অভিযোগ, জেনারেটর ও আইপিএস মেরামতের দোহাই দিয়ে তার স্কুল ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সাংবাদিক আলী আসগর আকনের অভিজ্ঞতা আরও করুণ। বরিশালের একটি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে মেয়েকে ভর্তি করতে তাকে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “সন্তানের জন্য ঋণ নিতে হচ্ছে। প্রতিবছর কেন আবার ভর্তি ফি দিতে হবে?”
আদালত থেকে নীতিমালা : নেপথ্যে এক আইনি লড়াই
এই অরাজকতা বন্ধে গত ২৫ জানুয়ারি জনস্বার্থে রিট মামলা করেন ভুক্তভোগী আলী আসগর ও রাজু আহমেদ। তাঁদের তথ্যমতে, পুনর্ভর্তি ফির নামে প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। এই রিটের পরই সরকার নড়েচড়ে বসে এবং নতুন নীতিমালা জারি করে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, চলতি বছরে যারা ইতিমধ্যে হাজার হাজার টাকা দিয়ে ফেলেছেন, সেই টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে নীতিমালায় কোনো নির্দেশনা নেই।
নীতিমালা না মানলে শাস্তি কী?
নতুন নীতিমালায় শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমপিও কর্তন এবং নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পাঠদানের অনুমতি বাতিলের মতো কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে এই শাস্তি কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে অভিভাবকদের মনে সংশয় রয়েই গেছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংকট
অভিভাবকদের বড় ক্ষোভ হলো, ‘উন্নয়ন ফি’ নেওয়া হলেও স্কুলের ভৌত কাঠামোর কোনো উন্নয়ন তারা চোখে দেখেন না। বেশিরভাগ সময় এই টাকা কোথায় খরচ হয়, তার কোনো অডিট বা হিসাব প্রকাশ করা হয় না। সরকারের তদারকি সংস্থাগুলোর নিশ্চুপ ভূমিকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
শেষ কথা : প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ
নীতিমালা হয়েছে, আইন হয়েছে, এখন প্রয়োজন এর কঠোর প্রয়োগ। শিক্ষা বাণিজ্য নয়, বরং একটি মৌলিক অধিকার। পুনর্ভর্তি ফির এই জগদ্দল পাথর সরাতে হলে কেবল প্রজ্ঞাপন জারি করলেই হবে না, প্রতিটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুবা ‘নতুন নীতিমালা’ কেবল আরেকটি কাগুজে বাঘ হয়েই থাকবে। বছরের শুরুতে অভিভাবকের পকেটে টান নয়, বরং শিশুর হাসিমুখেই শুরু হোক আগামীর বাংলাদেশ।

