বিশ্বজুড়ে আলোচিত ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনকে নিয়ে জল্পনা-কল্পনার যেন শেষ নেই। ২০১৯ সালে কারাগারে তাঁর রহস্যজনক মৃত্যুর পরও তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে নিত্যনতুন তথ্য সামনে আসছে। সম্প্রতি মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের একটি গোপন নথি প্রকাশিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র তোলপাড় শুরু হয়েছে। ওই নথিতে দাবি করা হয়েছে, এপস্টেইন কেবল একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বা যৌন অপরাধীই ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের একজন সুপ্রশিক্ষিত গুপ্তচর।

এফবিআই নথির চাঞ্চল্যকর দাবি
২০২০ সালের ১৯ অক্টোবরের একটি গোপন নথির ভিত্তিতে সম্প্রতি ‘মিডল ইস্ট মনিটর’সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই চাঞ্চল্যকর খবরটি প্রচার করেছে। এফবিআইয়ের ওই নথিতে দাবি করা হয়েছে, জেফরি এপস্টেইন মোসাদের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ এবং তাঁদের ফাঁদে ফেলার মিশনে নিযুক্ত ছিলেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য
নথিটি তৈরি করা হয়েছে একজন নির্ভরযোগ্য সূত্রের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে, যিনি এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ মহলের অত্যন্ত নিকটবর্তী ছিলেন। নথিতে বলা হয়েছে, এপস্টেইন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে গোয়েন্দা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন। বারাক এবং এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠতা বহু আগে থেকেই আলোচনার বিষয় ছিল, তবে এবার তা গোয়েন্দা কার্যকলাপে রূপ নিল।
‘ব্ল্যাকমেল’ রাজনীতি ও মোসাদের উদ্দেশ্য
এপস্টেইনকে নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি বড় সন্দেহ ছিল, তিনি কি তবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্ল্যাকমেল করার রসদ জোগাতেন? এফবিআইয়ের নথিটি সেই সন্দেহকেই উসকে দিচ্ছে।
প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ফাঁদে ফেলা: ধারণা করা হয়, এপস্টেইন তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপ বা বাসভবনে বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানাতেন। সেখানে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে তাঁদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড গোপনে ভিডিও করা হতো।

গোয়েন্দা কাজে ব্যবহার: এই সংগৃহীত তথ্য বা ভিডিও মোসাদের হাতে তুলে দেওয়া হতো, যাতে পরবর্তীতে সেই সব ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ওপর ইসরায়েলি স্বার্থে চাপ সৃষ্টি করা যায়। অর্থাৎ, এপস্টেইন ছিলেন মোসাদের একটি দীর্ঘমেয়াদী ‘অপারেশন’-এর অংশ।
অ্যালান ডারশোভিটজ ও মোসাদ সংযোগ
নথিতে এপস্টেইনের আইনজীবী এবং হার্ভার্ডের প্রখ্যাত অধ্যাপক অ্যালান ডারশোভিটজের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ডারশোভিটজ একসময় প্রকাশ্যেই বলেছিলেন যে, বয়স কম থাকলে তিনি মোসাদে যোগ দিতেন।
ফোনালাপের বিবরণ
এফবিআইয়ের নথিতে ডারশোভিটজ ও এপস্টেইনের একাধিক ফোনালাপের কথা রয়েছে। অবাক করা বিষয় হলো, এপস্টেইনের সঙ্গে ডারশোভিটজের কথা শেষ হওয়ার পরপরই মোসাদের পক্ষ থেকে ডারশোভিটজকে কল দেওয়া হতো। গোয়েন্দা সংস্থাটির উদ্দেশ্য ছিল কথোপকথনের বিস্তারিত তথ্য জানা। সূত্রটির বিশ্বাস, ডারশোভিটজকে মোসাদ তাদের মিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে নিযুক্ত করেছিল এবং তিনি এপস্টেইনের আইনি লড়াইয়ের আড়ালে গোয়েন্দা সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতেন।

এহুদ বারাক : শিক্ষক না কি পথপ্রদর্শক?
ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক কেন এপস্টেইনের মতো একজন বিতর্কিত ব্যক্তির সঙ্গে দিনের পর দিন বৈঠক করতেন, তা নিয়ে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে। এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বারাক শুধু বন্ধু ছিলেন না, তিনি ছিলেন এপস্টেইনের মেন্টর। তাঁর অধীনেই এপস্টেইন গোয়েন্দা জগতের কলাকৌশল রপ্ত করেছিলেন। এই তথ্যটি সত্যি হলে, এপস্টেইন কেলেঙ্কারি শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা ষড়যন্ত্র হিসেবে গণ্য হবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয় ও গোয়েন্দা বিতর্ক
এই নথি ফাঁসের পর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি এক নতুন মোড়। এফবিআই কেন এই নথিটি আগে প্রকাশ করেনি বা কেন এপস্টেইনের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ব্যবস্থা নেয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশ্বশান্তির ওপর প্রভাব: একজন বেসরকারি নাগরিক যখন রাষ্ট্রের হয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্ল্যাকমেল করেন, তখন সেটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির মেরুকরণ বদলে দিতে পারে।
অমীমাংসিত প্রশ্ন : ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের কারাগারে এপস্টেইনের ‘আত্মহত্যা’ কি আসলে তাঁর মুখ বন্ধ করার জন্য কোনো হত্যাকাণ্ড ছিল? মোসাদ সংযোগের খবর এই প্রশ্নটিকে আরও জোরালো করে তুলছে।
আধুনিক বিশ্বের বড় গোয়েন্দা কেলেঙ্কারি
জেফরি এপস্টেইন কেবল একজন অপরাধী হিসেবে নয়, বরং গোয়েন্দা রাজনীতির এক রহস্যময় চরিত্র হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিচ্ছেন। এফবিআইয়ের এই নতুন নথি প্রমাণ করে যে, রূপালি পর্দার গুপ্তচর গল্পের চেয়েও বাস্তব পৃথিবী অনেক বেশি জটিল ও ভয়ঙ্কর। এপস্টেইন কি তবে মোসাদের একজন ‘কো-অপ্টেড এজেন্ট’ হিসেবেই কাজ করে গেছেন? নথির তথ্য সত্য হলে, এটি আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বড় গোয়েন্দা কেলেঙ্কারি হিসেবে চিহ্নিত হবে।

