সাদা-কালো পর্দার সেই চিরচেনা ‘অপু’ হোক কিংবা ‘নয়নমণি’র সেই মায়াবী মুখ—দশক ছাড়িয়ে আজও তিনি বাংলার মানুষের হৃদয়ে অমলিন। বলছি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রনায়িকা ববিতার কথা। ২০২৬ সালের অমর একুশে পদকের তালিকায় যখন তার নামটি উচ্চারিত হলো, তখন যেন চলচ্চিত্রের এক সোনালী অধ্যায় আবারও নতুন করে ডানা মেললো। রাষ্ট্রীয় এই সর্বোচ্চ সম্মাননার খবরে বিনোদন অঙ্গনসহ সারা দেশে সংস্কৃতিপ্রেমীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তবে এই প্রাপ্তির খবরে বরাবরের মতোই বিনয়ী ও শান্ত ববিতা।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অভিনেত্রী ববিতা এক অনন্য নক্ষত্রের নাম। ষাট ও সত্তরের দশকে রুপালি পর্দায় তার অভিষেক হলেও তিনি নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যেখানে তিনি কেবল একজন অভিনেত্রী নন, বরং একটি প্রতিষ্ঠান। তার প্রকৃত নাম ফরিদা আক্তার পপি। পৈতৃক নিবাস বাগেরহাট জেলায়। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা চলচ্চিত্র আবহেই।

ববিতার অভিনয় জীবনের সবচেয়ে বড় মাইলফলক হলো বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় ‘অনঙ্গ’ চরিত্রে অভিনয়। এই ছবির মাধ্যমেই তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি লাভ করেন এবং দেশের নাম উজ্জ্বল করেন। তার অভিনয় দক্ষতা এতটাই বৈচিত্র্যময় ছিল যে, তিনি যেমন বাণিজ্যিক ধারার ছবিতে দর্শক মাতাতেন, তেমনি শিল্পঘেঁষা বা বিকল্প ধারার ছবিতেও হতেন অতুলনীয়।
প্রারম্ভিক জীবন ও চলচ্চিত্র যাত্রা
চলচ্চিত্র পরিবারেই তার বেড়ে ওঠা। বোন সুচন্দা এবং চম্পাও সিনেমার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ববিতার চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে ১৯৬৮ সালে জহির রায়হানের ‘সংসার’ সিনেমার মাধ্যমে। তবে নায়িকা হিসেবে তার প্রথম সাফল্য আসে ‘শেষ পর্যন্ত’ সিনেমার মাধ্যমে। তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয় জহির রায়হানের ‘টাকা আনা পাই’ চলচ্চিত্রটি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ববিতা
ববিতার অভিনয় জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় হলো বিশ্ববরেণ্য নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় অভিনয় করা। ১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রে তিনি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনঙ্গ বউ চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ান। সিনেমাটি বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘গোল্ডেন বিয়ার’ পুরস্কার জয় করে, যা ববিতাকে পৌঁছে দেয় আন্তর্জাতিক সম্মানের শিখরে। আজও যখন দক্ষিণ এশিয়ার সর্বকালের সেরা অভিনেত্রীদের তালিকা করা হয়, ববিতার নাম সেখানে অবধারিতভাবে থাকে।

অভিনয়ের বৈচিত্র্য ও জীবনমুখী চলচ্চিত্র
সত্তরের দশকে ববিতা ছিলেন গ্ল্যামার ও মেধার এক অনন্য সংমিশ্রণ। তিনি যেমন ‘লাইলি মজনু’র মতো রোমান্টিক সিনেমায় দর্শকদের বুঁদ করে রেখেছেন, তেমনি ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘নয়নমনি’, ‘দহন’ বা ‘সূর্যগ্রহণ’-এর মতো সামাজিক ও জীবনমুখী সিনেমায় নিজের অভিনয়ের গভীরতা ফুটিয়ে তুলেছেন। আমজাদ হোসেনের পরিচালনায় তার ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ সিনেমাটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক মাইলফলক। গ্রামীণ নারীর সংগ্রাম ও অধিকারের কথা তিনি যেভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আজও অবিস্মরণীয়।
ফ্যাশন আইকন ও স্বতন্ত্র শৈলী
ববিতা কেবল অভিনয়ের জন্য নয়, বরং তার রুচিশীল ফ্যাশন সচেতনতার জন্যও পরিচিত ছিলেন। তৎকালীন সময়ে তিনি ছিলেন তরুণীদের ফ্যাশন আইকন। তার চুলের ছাঁট, শাড়ির ধরন এবং চোখের মেকআপ অনুকরণ করত হাজারো তরুণী। তার মার্জিত এবং অভিজাত উপস্থিতি রূপালি পর্দায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
স্বীকৃতি ও বর্তমান জীবন
সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে ববিতা অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেছেন। তিনি রেকর্ডসংখ্যক আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে পেয়েছেন টানা তিন বছর। তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৬ সালে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘আজীবন সম্মাননা’ প্রদান করা হয়।
২০২৬ সালের একুশে পদক ঘোষণা: ফিরে দেখা
৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ঘোষিত হলো এ বছরের একুশে পদকপ্রাপ্তদের তালিকা। এদিন উপদেষ্টা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ১০ জন গুণী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করেন। শিল্প, সাহিত্য, শিক্ষা, সাংবাদিকতা এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই পদক প্রদান করা হয়।

একুশে পদক ২০২৬: পূর্ণাঙ্গ তালিকা
এ বছর ববিতা ছাড়াও সংগীতে মরণোত্তর সম্মাননা পেয়েছেন কিংবদন্তি গিটার জাদুকর আইয়ুব বাচ্চু এবং ব্যান্ড সংগীতে ইতিহাস গড়া দল ‘ওয়ারফেইজ’। এক নজরে দেখে নিন ২০২৬ সালের সকল পদকজয়ীর তালিকা:
চলচ্চিত্র: কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা।
সংগীত: আইয়ুব বাচ্চু (মরণোত্তর)।
ব্যান্ড মিউজিক: ওয়ারফেইজ।
সাংবাদিকতা: বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিক রেহমান।
স্থাপত্য: আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি মেরিনা তুবাসসুম।
চারুকলা: ডক্টর মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার।
নাট্যকলা: পালাকার ইসলাম উদ্দিন।
শিক্ষা: অধ্যাপক মাহবুবুল আলম মজুমদার।
ভাস্কর্য: তেজস হালদার।
নৃত্যকলা: অথৈ আহমেদ।
অনুপ্রেরণার বাতিঘর
একুশে পদক কেবল একটি পুরস্কার নয়, এটি দেশ ও জাতির পক্ষ থেকে গুণীজনদের প্রতি ভালোবাসার অর্ঘ্য। ববিতার মতো অভিনয়শিল্পী কিংবা আইয়ুব বাচ্চুর মতো সুরস্রষ্টার এই স্বীকৃতি তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে। আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতির এই নক্ষত্ররা তাদের কাজের মাধ্যমেই বেঁচে থাকবেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

