দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল যে, কোনো দেশকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাই যথেষ্ট। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো ইরানকে দমনের অস্ত্র হিসেবে একেই বারবার ব্যবহার করেছে। তবে বর্তমান ভূ-রাজনীতি এক নতুন সত্য সামনে নিয়ে আসছে। সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন যে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আসলে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। ইরানের ওপর সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের আবহ এবং নতুন করে নিষেধাজ্ঞার চাপ সেই অকার্যকরতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, যুদ্ধের দামামার মধ্যেই ইরান তার অর্থনীতিকে কেবল টিকিয়ে রাখছে না, বরং নতুন এক বিকল্প পথে অর্থনীতি চাঙা করে তুলছে।

নিষেধাজ্ঞার অসারতা ও মার্কিন আধিপত্যের সংকট
যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত বিশ্ববাণিজ্যে ডলারের আধিপত্যকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বৈশ্বিক লেনদেনের সিংহভাগ ডলারের মাধ্যমে হওয়ায়, যে কোনো দেশের জন্য ডলার নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানেই বড় ধাক্কা। তবে অতিনির্ভরশীলতার কারণেই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা দিন দিন কমছে। ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো এখন আর আগের মতো লক্ষ্যবস্তু হওয়া সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারছে না; বরং ইরান এই চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তর করছে। ডি-ডলারাইজেশন বা ডলার বিমুখতা এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক বিনিময় ব্যবস্থার মাধ্যমে তেহরান আন্তর্জাতিক লেনদেনের এক নতুন মেরুকরণ ঘটিয়েছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি: ইরানের নতুন অর্থনৈতিক ঢাল
নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ক্ষেত্রে ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। গত কয়েক বছরে তেহরান তার আর্থিক লেনদেনের জন্য ব্লকচেইন প্রযুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে শুরু করেছে। ব্লকচেইন তথ্য প্ল্যাটফর্ম ‘চেইন অ্যানালাইসিস’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত পক্ষগুলোর কাছে ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রবাহ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে এর পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৯০০ কোটি ডলার, ২০২৫ সালে তা প্রায় ৬৯৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড ১৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
হরমুজ প্রণালি ও ‘ট্রানজিট টোল’ মডেল
বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও এলএনজি পরিবহনের প্রধান পথ হলো হরমুজ প্রণালি। কৌশলগত এই অবস্থানের পূর্ণ সুবিধা নিচ্ছে ইরান। সাম্প্রতিক সময়ে এই পথে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ইরান ‘ট্রানজিট টোল’ বা মাশুল দাবি করতে শুরু করেছে। বিশেষ শর্ত হিসেবে তারা প্রতি ব্যারেলে অন্তত ১ ডলার করে মাশুল চায়, যা পরিশোধ করতে হয় বিটকয়েন অথবা রেনমিনবিতে।
টিথার বা ইউএসডিটির মতো স্টেবলকয়েনগুলো মার্কিন কর্তৃপক্ষ চাইলেই ফ্রিজ করতে পারে, কিন্তু বিটকয়েন বিকেন্দ্রীকৃত হওয়ায় তা আটকে দেওয়ার কোনো ক্ষমতা ওয়াশিংটনের নেই। চেইন অ্যানালাইসিসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনেক বড় বড় জাহাজ কোম্পানি কোনো ঝামেলা ছাড়াই এই পদ্ধতিতে মাশুল পরিশোধ করছে। বর্তমানে পারস্য উপসাগরে বিভিন্ন ট্যাংকারে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি ব্যারেল তেল রয়েছে। এই প্রণালি যদি পুরোদমে বিকল্প পেমেন্ট মডেলে মাশুল আদায় শুরু করে, তবে ইরানের রাজস্ব আয় আকাশচুম্বী হবে।
অপ্রথাগত পদ্ধতি: হুন্ডি ও বার্টারপ্রথা
ইরানের অর্থনীতি কেবল ক্রিপ্টোকারেন্সি বা রেনমিনবিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূলে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন ‘হুন্ডি’ বা ‘হাওয়ালা’ নেটওয়ার্ক। ইরানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শেল কোম্পানি বা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে দালেরা লেনদেন সম্পন্ন করে, যাতে সরাসরি ইরানের নাম কোথাও না আসে। এই প্রক্রিয়ায় কমিশন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় প্রতিবেশী দেশগুলোও এই ব্যবস্থার অংশীদার হয়ে উঠছে।
পাশাপাশি ‘পণ্য বিনিময় প্রথা’ বা ‘বার্টার সিস্টেম’ ইরানের অর্থনীতিতে প্রাণ ফিরিয়ে এনেছে। উদাহরণস্বরূপ:
- শ্রীলঙ্কা: ২০২১ সালের চুক্তি অনুযায়ী শ্রীলঙ্কা ইরানের কাছে তাদের চা রপ্তানির মাধ্যমে তেলের ঋণ শোধ করছে।
- পাকিস্তান: ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের শক্তিশালী বার্টার এগ্রিমেন্ট রয়েছে।
- ভারত: ভারতের সঙ্গে চালের বিনিময়ে তেল আমদানির আলোচনা চলছে।
- রাশিয়া: রাশিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পপণ্যের বিনিময় বাড়িয়ে ইরান ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে চলছে।
উপসংহার
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকৌশল কার্যত এক স্ববিরোধিতার জন্ম দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের ভীতি ইরানকে আধুনিক প্রযুক্তির (ক্রিপ্টোকারেন্সি) সঙ্গে প্রাচীন পদ্ধতির (বার্টার ও হুন্ডি) মেলবন্ধন ঘটিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতি গড়তে বাধ্য করেছে। দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হয়তো ইরান রাষ্ট্রটি হবে না, বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে বর্তমানের নিষেধাজ্ঞার এই বৈশ্বিক পদ্ধতি এবং ডলারের গরিমা। ইরানের এই ‘সারভাইভাল মডেল’ বিশ্বের অন্য নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশগুলোর জন্যও এক নতুন পথপ্রদর্শক হয়ে উঠছে। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে পরিচিত ডলারের যে একচ্ছত্র রাজত্ব, তার পতনের সূচনা সম্ভবত পারস্য উপসাগরের এই যুদ্ধের হাত ধরেই শুরু হয়েছে।

