এটি তাদের যুদ্ধ নয়, তবুও এই যুদ্ধের আগুনে পুড়তে হচ্ছে তাদেরই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং ইরানের ওপর সরাসরি হামলা মিত্র দেশগুলোর নেতাদের এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একদিকে ট্রাম্পের রক্তচক্ষু, অন্যদিকে নিজ দেশের ক্ষুব্ধ জনতা, এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন বিশ্বনেতারা। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের উত্তাপ এখন আর কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ এবং এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে এই যুদ্ধ মিত্র রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক চরম ‘দুঃস্বপ্নে’ পরিণত হয়েছে।

ট্রাম্পের সাথে মিত্রদের সম্পর্কের ফাটল
একসময় যারা ট্রাম্পকে তোষামোদ করতেন, তারা এখন তাঁর প্রকাশ্য সমালোচনা করছেন।
- যুক্তরাজ্য: প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জ্বালানি বিলের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে ট্রাম্পের ওপর চরম অসন্তুষ্ট। যুদ্ধের কারণে ব্রিটিশ জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া স্টারমার সরকারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
- ইতালি: ট্রাম্পের আদর্শিক মিত্র হিসেবে পরিচিত জর্জিয়া মেলোনিও এখন দূরত্ব বজায় রাখছেন। পোপকে নিয়ে ট্রাম্পের কটূক্তি মেলোনিকে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য করেছে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে মেলোনিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ ব্যক্তিদের তালিকায় ফেলেছেন।
অর্থনৈতিক মন্দা ও আইএমএফ-এর সতর্কতা
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ২.৫ শতাংশ করেছে।
- যুক্তরাজ্য: ব্রিটেনের প্রবৃদ্ধি ১.৩ শতাংশ থেকে নেমে ০.৮ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
- জাপান: মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর চরম নির্ভরশীল জাপান এখন পরিবহন ব্যয় ও তেলের দাম বাড়ায় ভয়াবহ সংকটে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নতুন সরকার এখন জনরোষের মুখে।
ট্রাম্পের একতরফা নীতি ও ন্যাটো
ট্রাম্প ন্যাটোকে কোনো রক্ষণাত্মক জোট হিসেবে দেখছেন না; বরং একে নিজের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান। যারা ইরান যুদ্ধে যোগ দিচ্ছে না, তাদের প্রতি ট্রাম্পের সহনশীলতা শূন্যের কোঠায়। এটি দশকের পর দশক ধরে চলে আসা পশ্চিমা সামরিক ও রাজনৈতিক জোটগুলোর অস্তিত্বকে সংকটে ফেলেছে।
ইউরোপে জনতুষ্টিবাদের পতন
হাঙ্গেরির নির্বাচনে ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের শাসনের অবসান ট্রাম্পের জন্য এক বড় ধাক্কা। ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের প্রচার সত্ত্বেও অরবানের পরাজয় প্রমাণ করে যে, ইউরোপের ভোটাররা এখন ট্রাম্পের ছায়া থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিতে চায়।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ভোটাররা এই যুদ্ধকে ‘অযৌক্তিক’ এবং ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ বলে মনে করেন। নাইন-ইলেভেন পরবর্তী যুদ্ধে মিত্র সেনাদের আত্মত্যাগকে ট্রাম্প যেভাবে হেয় করেছেন, তা সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। ফলে ট্রাম্পের পাশে দাঁড়ানো এখন যেকোনো নেতার জন্য বড় ধরণের ‘রাজনৈতিক দায়’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিশেষ
পরিশেষে বলা যায়, ইরান যুদ্ধে সরাসরি না জড়িয়েও মার্কিন মিত্ররা কোনোভাবেই বিপদমুক্ত থাকতে পারছেন না। অর্থনৈতিকভাবে জ্বালানি সংকট আর রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের একতরফা খবরদারি, এই দুইয়ের মিলনস্থলে দাঁড়িয়ে আছেন কিয়ার স্টারমার বা জর্জিয়া মেলোনির মতো নেতারা। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি মিত্রদের স্বার্থকে বারবার পদদলিত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যকার ঐক্যকে ভেঙে দিতে পারে। ইরান যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য নয়, বরং ইউরোপ ও এশিয়ার স্থিতিশীলতাকেও এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এই সংঘাতের ক্ষত সহজে শুকানোর নয়।

