ইরানের দীর্ঘ চার দশকের শাসক আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আকস্মিক মৃত্যুর পর দেশটির শাসনব্যবস্থায় এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তাঁর নিহতের খবর বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, কে হচ্ছেন ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা?
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, নতুন নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ আলেমের সমন্বয়ে গঠিত ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর ওপর। তবে বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় এই পরিষদ কত দ্রুত বা কীভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে মূলত পাঁচজনের নাম জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে।

মোজতবা খামেনি (৫৬)
আলী খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনিকে সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার মনে করা হয়। পর্দার আড়ালে থেকে তিনি দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী আইআরজিসি (IRGC) এবং বাসিজ বাহিনীর ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন। তবে ইরানের বিপ্লবী আদর্শে বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব (বাবা থেকে ছেলে) ভালো চোখে দেখা হয় না। এছাড়া তিনি উচ্চপদস্থ আলেম নন, যা তাঁর জন্য একটি বড় বাধা হতে পারে।
আলিরেজা আরাফি (৬৭)
প্রতিষ্ঠিত আলেম এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আলিরেজা আরাফি খামেনির অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর ডেপুটি চেয়ারম্যান। তিনি আরবি ও ইংরেজিতে সাবলীল এবং প্রযুক্তি ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত। তবে নিরাপত্তাকাঠামো বা সামরিক বাহিনীর সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা মোজতবা খামেনির তুলনায় কম।
মোহাম্মদ মেহদি মিরবাঘেরি (৬০)
কট্টরপন্থী আলেম হিসেবে পরিচিত মিরবাঘেরি পশ্চিমা বিশ্বের ঘোরবিরোধী। তিনি বিশ্বাস করেন যে, বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য। তিনি রক্ষণশীল ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন এবং বর্তমানে ইসলামিক সায়েন্সেস একাডেমির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
হাসান খোমেনি (৫০)
তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি। তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য তাঁকে এক ধরণের ধর্মীয় বৈধতা দেয়। তবে তিনি সংস্কারপন্থী বা কম কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত হওয়ায় বর্তমান শাসনব্যবস্থায় তাঁর অবস্থান কিছুটা নড়বড়ে। ২০১৬ সালে তাঁকে নির্বাচনে লড়ার অনুমতিও দেওয়া হয়নি।
হাশেম হোসেইনি বুশেহরি (৬০)
বুশেহরি একজন জ্যেষ্ঠ আলেম এবং ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর প্রথম ডেপুটি চেয়ারম্যান। তিনি খামেনির ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে তাঁর প্রভাব রয়েছে। তবে সাধারণ জনগণের কাছে তাঁর পরিচিতি তুলনামূলক কম।
পরবর্তী নেতা হওয়ার যোগ্যতা কী?
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতাকে অবশ্যই নিচের যোগ্যতাগুলো পূরণ করতে হবে:
- লিঙ্গ: অবশ্যই পুরুষ হতে হবে।
- ধর্মীয় জ্ঞান: উচ্চপদস্থ আলেম বা মুজতাহিদ হতে হবে।
- গুণাবলি: রাজনৈতিক দক্ষতা, নৈতিক সততা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি অবিচল আনুগত্য থাকতে হবে।
একনজরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তুলনা
| প্রার্থীর নাম | বয়স | শক্তি / অবস্থান | চ্যালেঞ্জ |
| মোজতবা খামেনি | ৫৬ | আইআরজিসি ও সামরিক সমর্থন | বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের বিতর্ক |
| আলিরেজা আরাফি | ৬৭ | প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও বিশ্বস্ততা | রাজনৈতিক প্রভাব কিছুটা কম |
| মেহদি মিরবাঘেরি | ৬০ | চরম রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থী | আধুনিক বিশ্বের সাথে দূরত্বের ঝুঁকি |
| হাসান খোমেনি | ৫০ | খোমেনি পরিবারের উত্তরাধিকার | সংস্কারপন্থী হিসেবে কোণঠাসা |
উপসংহার : সারা বিশ্বের নজর তেহরানের দিকে
ইরানের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ কাকে বেছে নেবে, তার ওপর নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতি। যদি তারা মোজতবা খামেনিকে বেছে নেয়, তবে তা রাজতন্ত্রের মতো দেখাবে; আবার যদি কোনো কট্টরপন্থীকে বেছে নেয়, তবে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সংঘাত আরও বাড়তে পারে। সারা বিশ্বের নজর এখন তেহরানের দিকে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন, ইরানওয়্যার এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম।

