মেজর (অব.) মো. আখতারুজ্জামান :: বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে জানা যায় যে, রাষ্ট্রপতি জনাব জিল্লুর রহমান গত ২০ শে মার্চ বিকাল ৪টা ৪৭ ঘটিকায় সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ইন্তেকাল করিয়াছেন (ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন)। তার মৃত্যু সংবাদটি অত্যন্ত সাদামাটাভাবে এবং সম্পূর্ণ রাষ্ট্রাচার বর্হিভূত ও বেআইনিভাবে রাষ্ট্রপতির একজন স্টাফ অফিসার বিভিন্ন মিডিয়ার কাছে প্রকাশ করেন। যাহা কোনভাবেই কাম্য ও গ্রহণযোগ্য নয়। যেভাবে রাষ্ট্রপতির মৃত্যুর সংবাদটি ঘোষিত ও প্রচারিত হয়েছে তাহা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায়না। রাষ্ট্রপতি কোন ব্যক্তি নন। তিনি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ এবং প্রতিষ্ঠান।
সরকার শুধু রাষ্ট্রপতির মৃত্যুর ঘোষণা ও প্রচার করার ব্যাপারে নির্মম গাফিলতি করে নাই, তার মৃত্যুর পরে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ঘোষণাতেও সরকার চরম অবজ্ঞা দেখিয়েছে। সরকার প্রথমে রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে তিনদিনের জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করেন। দ্বিতীয় ধাপে কিছুক্ষণ পরে বৃহস্পতিবার জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হইবে বলিয়া জানানো হয়। তৃতীয় ধাপে একদিন পরে অফিস শুরু হয়ে যাওয়ার কয়েক ঘন্টা পরে ২১ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। যাহার ফলে সারা দেশে একটি হ-য-ব-র-ল অবস্থা সৃষ্টি হয়ে যায়।
রাষ্ট্র একটি নিয়মের মধ্যে চলে এবং সরকারকেও সেই নিয়ম মেনে চলা বাঞ্ছনীয়। রাষ্ট্রের সর্বময় নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে। রাষ্টের সকল নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নির্দেশে নেওয়া হয়েছে বলিয়া বিবেচিত হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতির নিয়মিত বা রুটিন কাজগুলি সমাধা করিতে পারেন। রাষ্ট্রপতির মৃত্যু ঘোষণা, জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা, তিনদিনব্যাপী জাতীয় শোক দিবস ও ২১ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার কার্যক্রম কোন অবস্থাতেই রাষ্ট্রপতির নিয়মিত বা রুটিন কাজ হিসাবে গন্য হতে পারেনা। এ কাজগুলো অবশ্যই বিশেষ এবং ক্রান্তিকালীন সিদ্ধান্ত, যা নেওয়ার অধিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে বর্তমান সংবিধান দেয় নাই।
বিদ্যমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীকেও নিজের এখতিয়ারে কোন নির্বাহী সিদ্ধান্ত নেওয়া বা প্রকাশিত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন তাও রাষ্ট্রপতির নামে অথবা মন্ত্রী পরিষদের সিদ্ধান্ত হিসাবে নিতে হবে। কাজেই রাষ্ট্রপতির মৃত্যু ঘোষণা ও তৎপরবর্তী নির্বাহী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোন সাংবিধানিক ক্ষমতা সরকারের ছিল না। এ বিষয়গুলো উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছেনা বরং অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সাংবিধানিক ক্ষমতা ও প্রয়োগের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে।
ক্ষমতায় থাকাকালীন আমরা অনেকেই অনেক কিছু অতীতেও করেছি এবং বর্তমানেও করে যাচ্ছি। যার খেসারত পরে জাতিকেই দিতে হয়। তাই মহামান্য রাষ্ট্রপতির মৃত্যু ও তৎপরবর্তী সিদ্ধান্তসমূহ নেওয়ার পূর্বে আরও বেশি সংবেদন, দায়িত্বশীল ও আরও সম্মানজনক বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিলে তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগে অনেক ইতিবাচক ও অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত হিসাবে জনগণের সামনে ফুঁটে উঠত।
রাষ্ট্রপতির মৃত্যু ঘোষণা ও তৎপরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে মন্ত্রী পরিষদের জরুরি সভা আহ্বান করার প্রয়োজন ছিল। উক্ত সভায় মহামান্য রাষ্ট্রপতির মৃত্যু ঘোষণা ও তৎপরবর্তী সিদ্ধান্তসমূহ নিলে তা অনেক বেশি সঠিক, গণতান্ত্রিক ও সম্মানজনক হতো এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হতো।
এখানে আরো একটি বিষয় অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করতে চাই যে, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান তার ৮৫তম জম্মদিন ৯ মার্চ ২০১৩ সনে সকাল ১০.০০ ঘটিকায় রাষ্ট্রপতি ভবনে বুকে ব্যাথা অনুভব করেন। একই দিন রাত ১০ ঘটিকায় তাহাকে চিকিৎসার জন্যে ঢাকা সিএমএইচ এ নেওয়া হয় এবং তারও একদিন পরে ১১ মার্চ সকালে তাকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাষ্ট্রপতির বুকে ব্যথা অনুভুত হওয়ার ৪৮ ঘন্টা পরে কেন তার চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হলো তা জানার অধিকার অবশ্যই জনগণের আছে। জনগণ অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানতে চায় কেন, কী কারণে এবং কার গাফিলতিতে ৯ মার্চের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া সম্ভব হলো না? আমি সরকারের কাছে জনগণের পক্ষ থেকে এর সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি।
লেখক: মেজর মো. আখতারুজ্জামান (অব.), সাবেক সংসদ সদস্য ও কলামিস্ট
ই -মেইল : [email protected]
