নিউইয়র্ক টাইমসের দুই প্রতিবেদক জোনাথন সোয়ান ও ম্যাগি হাবারম্যানের ‘রেজিম চেঞ্জ: ইনসাইড দি ইমপেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অব ডোনাল্ড ট্রাম্প’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক অত্যন্ত গোপনীয় বৈঠকের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি সুপরিকল্পিত উপস্থাপনা।

হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে সেই গোপন বৈঠক (১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)
নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউসে পৌঁছানোর পর সাংবাদিকদের আড়ালে সরাসরি সিচুয়েশন রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি ট্রাম্প ও তাঁর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সামনে ইরানের শাসন পরিবর্তনের একটি মহাপরিকল্পনা পেশ করেন।
- উপস্থাপনার মূল লক্ষ্য: নেতানিয়াহু যুক্তি দেন যে এটিই ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার “সুবর্ণ সুযোগ”।
- ট্রাম্পের অবস্থান: ট্রাম্প সাধারণ মেহগনি টেবিলের মাথায় না বসে পাশের দেয়ালে লাগানো পর্দার দিকে মুখ করে বসেন, যা ইঙ্গিত দিচ্ছিল তিনি পুরোপুরি নেতানিয়াহুর উপস্থাপনায় নিবিষ্ট।
নেতানিয়াহুর চার স্তরের পরিকল্পনা ও মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন
নেতানিয়াহু তাঁর পরিকল্পনাকে ৪টি মূল ভাগে ভাগ করেছিলেন। তবে ১২ ফেব্রুয়ারি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (CIA) এর মূল্যায়ন করতে গিয়ে দ্বিমত পোষণ করে:
| নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা | মার্কিন গোয়েন্দা (CIA) ও সামরিক মূল্যায়ন |
| ১. নেতৃত্ব ছেঁটে ফেলা: শীর্ষ নেতাদের (যেমন খামেনি) হত্যা। | সম্ভব: এটি সামরিকভাবে অর্জনযোগ্য বলে মনে করা হয়। |
| ২. সামরিক শক্তি ধ্বংস: ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা পঙ্গু করা। | সম্ভব: মার্কিন সামরিক সক্ষমতা দিয়ে এটি করা যায়। |
| ৩. অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থান: জনগণের দাঙ্গা ও বিদ্রোহ উসকে দেওয়া। | বাস্তববর্জিত: সিআইএ একে ‘প্রহসনমূলক’ বলে অভিহিত করে। |
| ৪. শাসন পরিবর্তন: নির্বাসিত শাহজাদাকে বসিয়ে নতুন সরকার। | ফালতু: পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও এই অংশটিকে গুরুত্বহীন মনে করেন। |
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের চালিকাশক্তি
কেন ট্রাম্প এই যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী হলেন? এর পেছনে কয়েকটি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কারণ কাজ করেছে:
- ভেনেজুয়েলা মডেলের সাফল্য: ভেনেজুয়েলার নেতা মাদুরোকে সফলভাবে কমান্ডো অভিযানে ধরে আনার পর ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাস কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল।
- ব্যক্তিগত প্রতিশোধ: সোলাইমানি হত্যার পর থেকে ইরান ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে -এমন গোয়েন্দা তথ্য ট্রাম্পকে কঠোর অবস্থানে নিয়ে যায়।
- শাসন পরিবর্তনের নেশা: ট্রাম্প প্রথম আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের অবসান ঘটানোর কৃতিত্ব নিতে চেয়েছিলেন।
প্রশাসনের ভেতরে মতভেদ
ট্রাম্পের উপদেষ্টা বৃত্তে এই যুদ্ধ নিয়ে তীব্র বিতর্ক ছিল:
- জেডি ভ্যান্স (ভাইস প্রেসিডেন্ট): তিনি ছিলেন এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিরোধী। তিনি মনে করতেন শাসন পরিবর্তনের পরিকল্পনা সফল হবে না।
- জেনারেল ড্যান কেইন: তিনি সরাসরি না বললেও অস্ত্রভাণ্ডার ফুরিয়ে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন।
- সুসি উইলিস (চিফ অব স্টাফ): তিনি রাজনৈতিক ফলাফল ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, তবে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেননি।
চূড়ান্ত সংকেত: ‘আমার কাছে ভালোই শোনাচ্ছে’
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ‘প্রহসনমূলক’ বা ‘ফালতু’ বলার পরও ট্রাম্প নেতানিয়াহুর উপস্থাপনার প্রথম দুই অংশের (শীর্ষ নেতাদের হত্যা ও সামরিক শক্তি ধ্বংস) ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, যুদ্ধটি খুব দ্রুত এবং ‘সিদ্ধান্তমূলক’ হবে।
শেষ কথা
ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি এবং ইসরায়েলি নেতৃত্বের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে এক অনিশ্চিত যুদ্ধের পথে ঠেলে দেয়। যদিও তাঁর অনেক অভিজ্ঞ উপদেষ্টা শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাস এবং দ্রুত বিজয়ের আকাঙ্ক্ষাই শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে পাল্টে দেয়। এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি সামরিক অভিযান ছিল না, বরং এটি ছিল ট্রাম্পের ‘ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি’ বা সম্রাটের মতো ক্ষমতা প্রয়োগের এক বড় উদাহরণ।

