পুরোনো দিনে বা প্রস্তর যুগের মানুষের খাদ্যাভ্যাস কেমন ছিলো, এটি মানুষের জানার অনেক আগ্রহ। সে জুগে আমাদের জামানার মতো রেডিমেড খাবার প্রস্তুত থাকতো না। মূলত দিনের খাবার পাওয়াটাই ছিলো প্রধান কাজ।
তাদের খাবার কেমন হতো তা বলা খুব কঠিন তবে সে জুগের মানুষের খাদ্যাভ্যাস থেকে আন্দাজ করা যায়, প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষের খাবার গ্রহণের পদ্ধতি কেমন ছিল।

প্রস্তর যুগ সহজ কথায় স্টোন এইজ এর খাদ্যাভ্যাসের পুনর্মূল্যায়ন করতে হলে ফিরতে হবে ২৫ লাখ বছর আগে, যা চলমান ছিল প্রায় ১০ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে কৃষিকাজ আবিষ্কারের আগপর্যন্ত। অতীতের মানুষ ছিল এখনকার তুলনায় বেশ বড় আকৃতির, এ কথা কম-বেশি সবাই জানে। সে সময় মানুষের মস্তিষ্কের আকার বড় ছিল অন্ত্রের আকারের তুলনায়। এই বিবর্তনীয় পরিবর্তন সম্ভবত পুষ্টিসমৃদ্ধ, সহজে হজমযোগ্য খাবার খাওয়ার অভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বড় মস্তিষ্কের কারণে বর্ধিত বুদ্ধিমত্তাও ছিলো তাদের। তাদের দেহ বড় হওয়ার কারণে সেই সময়কার মানুষের দেহে ক্যালরি ও পুষ্টির চাহিদাও বেশি ছিলো। প্যালিওলিথিক যুগের অধিবাসীরা পাথরের যন্ত্রপাতি তৈরি করতেন, যা তারা শিকার কিংবা খাবার সংগ্রহ, প্রস্তুত ও রান্না করতে ব্যাবহার করতো।
তারা বুঝতে পেড়েছিল, রান্না করে খেলে খাবার সহজে হজমযোগ্য হয় এবং উদ্ভিদ ও প্রাণিজ খাবার থেকে আরও শক্তি আহরণ করা যাবে।
তারা ছিলেন এককথায় সর্বভুক; তবে জলবায়ু, অবস্থান ও ঋতুর ওপর নির্ভর করে তাদের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন আনতে হতো। তারা স্বভাবতই অধিক মাংস ও কম কার্বোহাইড্রেটযুক্ত ডায়েটে অভ্যস্ত ছিল, যা প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহক জাতির খাদ্যাভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করে বলা হয়েছ।
১৯৮৫ সালে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে একটি আর্টিকেল প্রকাশ করেন মার্কিন রেডিওলজিস্ট ড. এস. বয়েড ইটন। সেখানে তিনি বলেন, আধুনিক দীর্ঘস্থায়ী রোগগুলো বর্তমান ডায়েট ও মানুষের বিবর্তিত খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে একটি অসংগতির ফল। তার যুক্তি হলো, প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকদের খাদ্যই আজকের মানুষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
২০০২ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী ড. লরেন করডেইন ‘দ্য প্যালিও ডায়েট: লুজ ওয়েট অ্যান্ড গেট হেলদি বাই ইটিং দ্য ফুডস ইউ ওয়ার ডিজাইনড টু ইট’ বইটি প্রকাশের পর স্টোন এইজ এর ডায়েট ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
এরপর থেকে সাধারণ মানুষের কাছে ‘গুহাবাসীর ডায়েট’ নামে পরিচিত এই খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে। এর সমর্থকদের দাবি, এটি আধুনিক খাদ্যাভ্যাসকে আমাদের পূর্বপুরুষদের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে এবং এমন খাবার উপাদানগুলোকে গুরুত্ব দেয়, যা মানুষের পক্ষে খাওয়ার উপযোগী।
বর্তমানের প্যালিও ডায়েটে সবজি, ফল, লিন মিট বা চর্বিহীন মাংস, বাদাম, মাছ, মধু ও ডিমের মতো খাবার অধিক গুরুত্ব পায়। যেখানে বাদ পড়ে শস্যদানা, দুগ্ধজাত, ডালজাতীয়, অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার। যা ওজন কমাতে ব্যাপক কার্যকরী।
যদিও শীর্ষস্থানীয় স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো একে ব্যাপকভাবে সমর্থন করে না। কারণ এর সম্পর্কে পুরো ডিটেইল জানা নেই কারও এর থেকে যদি কোন ক্ষতি হয় তবে এর সমাধান কিভাবে সক্ষম হবে তা নিয়ে রয়েছে ডিবেট।
যেমন, এ ধরনের খাবার গ্রহণের ভয়াবহ পরিণতি হলো স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কার্ডিওভাসকুলার সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলোর প্রসার। খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারার পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ—উভয়েই এই প্রবণতা পাল্টানোর জন্য সমাধান খুঁজছেন।
গবেষণার পর আন্দাজ করা হয় যে আদিম যুগের মানুষ সাধারণত চাষাবাদ না করা ফলমূল, শিকড় বা আলুজাতীয় উদ্ভিদ, সবজি এবং মাঝেমধ্যে মধু, মাছ ও মাংস খেতেন। তারা বিভিন্ন মাত্রায় চর্বি ও প্রোটিন গ্রহণ করতেন এবং উদ্ভিদজাত আঁশসমৃদ্ধ খাদ্যও খেতেন।
আইসোটোপিক (একধরনের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া) বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পুরাতাত্ত্বিক সময়ে কোনো সর্বজনীন খাদ্যাভ্যাস ছিল না, তা প্রমাণিত করা হয়েছে। তারা উদ্ভিদভিত্তিকও বিভিন্ন খাদ্য গ্রহণ করতেন, সেগুলোর মধ্যে ছিল বীজ, বনজ ফল ও সবজি, বাদাম এবং কম পরিমাণে মাংস ও মাছ।
বিলুপ্ত প্রাচীন মানব সম্প্রদায় বা নিয়ানডার্থালের দাঁতের ক্যালকুলাস থেকে পাওয়া মাইক্রোফসিল পরীক্ষায় আধুনিক ইরাক ও বেলজিয়ামে উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে ছিল খেজুর, শিম ও বীজ।
কিছু চিহ্নিত উদ্ভিদের স্টার্চ বা মাড় রান্নার মাধ্যমে রাসায়নিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মেলে। পৃথিবীর প্রাগৈতিহাসিক বাসিন্দারা প্রধানত প্রাণিজ প্রোটিন ও কাঁচা খাবারের ওপর নির্ভর করতেন বেশি বলে ধারণা করা হয়।
গবেষণা থেকে জানা গেছে, দুই ডজনের কম সমসাময়িক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এখনও বিভিন্ন অঞ্চল ও জলবায়ুতে বসবাস এবং শিকারি-সংগ্রাহক বা স্টোন এইজ এর মতো জীবনধারা অনুসরণ করে। এর মাঝে ব্যাপকভাবে গবেষণা করা গোত্রটি হলো উত্তরের তানজানিয়ার হাদজা নৃগোষ্ঠী।
তাদের খাদ্যাভ্যাস প্যালিও ডায়েটের বৈশিষ্ট্য-ই বহন করে, যা সম্পূর্ণ ও অপরিবর্তিত বা আনপ্রসেসড খাবারকে গুরুত্ব এবং শস্য, দুধজাত ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যগুলোকে বাদ দেয়। তারা ফাইবার ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য খান এবং মূলত উদ্ভিজ্জ শিকড়, জামজাতীয় ফল, মাংস, বাওবাব ফল ও মধু গ্রহণ করেন।
আর হিমশীতল অঞ্চলে বসবাসকারীরা মধ্যে মাছ আহরণই খাদ্যের চাহিদা পূরণের প্রধান কর্ম; তারা প্রাণিজ খাবার থেকে উষ্ণ অঞ্চলের শিকারিদের তুলনায় অধিক ক্যালরি সংগ্রহ করেন।
গবেষণার মাধমে জানা যায়, প্যালিওলিথিক যুগের খাদ্যতালিকা সম্ভবত বিশেষ কয়েকটি খাবারের সমন্বয়ে গঠিত ছিল। উদ্ভিদজাত, যা ছিলো বীজ, বাদাম, বুনো বার্লি পিষে তৈরি আটা, ফল, বেরি ও ফুল।
এগুলো সাধারণত মাটির নিচে থাকে এবং দেখতে আধুনিক সময়ের গাজর, পার্সনিপ ও আলুর মতো। প্রাণিজাত, যেখানে ছিলো বড় ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, আর সংগ্রহ করা ডিম। মাছ বা শেলফিশ, লবণাক্ত পানির তাজা মাছগুলো মূলত। কীটপতঙ্গ আর মধু এগুলোই মূলত সে যুগের মানুষের জীবিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।

