ইটালি ও আলবেনিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত আশ্রয় প্রক্রিয়াকরণ চুক্তির এক বছর পূর্তিতে ফুটে উঠেছে এর ব্যর্থতার চিত্র৷ আলবেনিয়ার শেনজিন ও জাদারে নির্মিত দুটি অভিবাসী কেন্দ্র প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে৷

গত এক বছরে মাত্র ১৩২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে সেখানে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ইটালির মানবাধিকার সংস্থাগুলো৷ তারা বলছে, “এই প্রকল্পটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ।”
২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর চুক্তি অনুযায়ী প্রথম ১৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে ইটালি থেকে আলবেনিয়ায় পাঠানো হয়৷ মিশর ও বাংলাদেশের নাগরিকদের নিয়ে জাহাজটি শেনজিন বন্দরে পৌঁছায়৷ একই সময়ে জাদারের একটি পুরোনো সামরিক ঘাঁটিতেও আরেকটি কেন্দ্র চালু করা হয়৷
রোম-তিরানা চুক্তি অনুসারে, বছরে সর্বোচ্চ ৩৬ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীকে ইটালির জলসীমায় আটক করে আলবেনিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল৷ উদ্দেশ্য ছিল আশ্রয় প্রক্রিয়ার একটি অংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে স্থানান্তর করে ইতালির অভ্যন্তরীণ চাপ কমানো৷
কিন্তু এক বছর পর চুক্তিটি বাস্তবে ব্যর্থ হয়েছে৷ ইটালির এনজিওগুলোর প্রতিবেদন ‘বর্ডার ইনজুরিজ’-এর বরাত দিয়ে অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ জিয়ানফ্রাঙ্কো শিয়াভোনে বলেন, “এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩২ জনকে আলবেনিয়ায় পাঠানো হয়েছে, তাদের মধ্যে ৩২ জনকে আবার ইটালিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে আদালতের রায়ে৷ এটি নিঃসন্দেহে এক ‘বিভ্রান্তিকর ব্যর্থতা’।’’
আইনি জটিলতা ও নীতি-সংঘাত
শুরু থেকেই প্রকল্পটি নানা আইনি জটিলতার মুখে পড়ে৷ প্রথম দফায় পাঠানো ১৬ জন অভিবাসীর মধ্যে চার জনকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে ফের ইটালিতে আনা হয়৷ পরে বাকি ১২ জনের আটকের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে আদালত৷
ইউরোপীয় ইউনিয়নের তালিকাভুক্ত ‘নিরাপদ দেশ’ সংক্রান্ত এক মতবিরোধের কারণে রোমের আদালত তাদের আটকাদেশ বাতিল করে দেয়৷ ফলে ওই ১২ জনকেও পরে ইটালিতে ফিরিয়ে আনা হয়৷
২০২৪ সালের নভেম্বর ও ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত আরও দুই দফায় আলবেনিয়ায় পাঠানো অভিবাসীদের আটকের বৈধতা স্থগিত করে৷ এভাবে এক বছরের মধ্যেই প্রায় ৪০ জনকে ইটালিতে ফিরিয়ে আনতে হয় সরকারকে৷
কেন্দ্রগুলোর রূপান্তর ও সমালোচনা
ক্রমাগত ব্যর্থতার পর ২০২৫ সালের মার্চে প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনির সরকার একটি ডিক্রি জারি করে শেনজিন ও জাদারের আশ্রয়কেন্দ্র দুটিকে ‘প্রত্যাবাসন কেন্দ্র’ হিসেবে রূপান্তর করে৷
এই কেন্দ্রগুলোতে এখন শুধুমাত্র ইটালিতে আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত এবং দেশে ফেরত পাঠানোর অপেক্ষায় থাকা অভিবাসীদের রাখা হচ্ছে৷ তবে সেখানে অভিবাসীদের কতদিন পর্যন্ত আটক রাখা যাবে তা স্পষ্ট নয়৷
অভিবাসনবিষয়ক আইনজীবী গুইদো সাভিও বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, এই কেন্দ্রগুলো কার্যত ফাঁকা, বিপুল অর্থ খরচ হচ্ছে, কিন্তু কোনো কার্যকর ফল নেই। সরকার কেবল দেখাতে চায় যে কেন্দ্রগুলো কোনো না কোনোভাবে চলছে।
ইটালির সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুনে জাদারের কেন্দ্র থেকে পাঁচজন মিশরীয় নাগরিককে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয় । সেটিই এখন পর্যন্ত সরকারের একমাত্র ‘সফল’ প্রত্যাবাসন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে৷
ইইউ আদালতের রায় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
চলতি বছরের ১ আগস্ট ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদালত চুক্তির আইনি ভিত্তি বাতিল করে রায় দেয়৷ আদালতের ভাষ্য, কোনো দেশকে ‘নিরাপদ’ হিসেবে ঘোষণা করা যাবে না যদি তার ভূখণ্ডে আশ্রয়প্রার্থীরা পর্যাপ্ত সুরক্ষা না পান৷
অন্যদিকে, তিরানা সরকার কেন্দ্রগুলোর অবস্থা বা সেখানে অভিবাসীদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে৷ ইটালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এসব বিষয়ে মন্ত্রী ইতিমধ্যে বহুবার ব্যাখ্যা দিয়েছেন৷
ইটালির বামপন্থি সংবাদমাধ্যম ইল মানিফেস্টোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, “আলবেনিয়ার এসব কেন্দ্রে স্বাস্থ্যসেবা সীমিত, আইনি সহায়তা প্রায় অপ্রাপ্য এবং মানবাধিকার চরমভাবে খর্ব হচ্ছে।”
মানবাধিকার কর্মী জিয়ানফ্রাঙ্কো শিয়াভোনে বলেন, “ইউরোপীয় আইনের বিরোধিতা করে ইতালি এখন বিদেশের মাটিতে অভিবাসী আটক রাখছে, যা ইইউর প্রত্যাবাসন নির্দেশিকার সরাসরি লঙ্ঘন।”
বর্তমান ইউরোপীয় আইনে ইইউ অঞ্চলের বাইরে অভিবাসী আটক বা আশ্রয় প্রক্রিয়া পরিচালনার সুযোগ নেই৷
তবে ইউরোপীয় কমিশন ২০০৮ সালের ‘রিটার্ন ডিরেকটিভ’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে, যার ফলে ভবিষ্যতে ইউরোপের বাইরে অভিবাসী আটককেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ তৈরি হতে পারে৷
২০২২ সালে ক্ষমতায় আসা ইটালির অতি-ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি আশ্রয়প্রার্থী প্রত্যাবাসনকে নিজের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন৷
বিশ্লেষকদের মতে, আলবেনিয়া চুক্তিতে ব্যর্থ হয়ে এখন তিনি ইউরোপীয় আইন সংশোধনের মাধ্যমে একই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছেন৷

