মানুষের একটা ছোট ভুল বা একটা সামান্য ঘটনাই পুরো পৃথিবীর মানচিত্র ও ইতিহাস ওলটপালট করে দিতে পারে। আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে ঠিক তেমনই এক ঘটনা ঘটেছিল। একটি মাত্র হত্যাকাণ্ড পুরো বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী এক মহাযুদ্ধের দিকে, যা আমরা ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধ’ (First World War) নামে জানি।
কিন্তু আসলেই কি শুধু একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডই এমন এক প্রলয়ংকরী যুদ্ধ ডেকে এনেছিল? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভ, সাম্রাজ্যবাদ, সামরিক জোট এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতার এক জটিল বিষাক্ত সমীকরণ? চলুন, ইতিহাসের সেই ধোঁয়াটে পাতাগুলো থেকে ঘুরে আসা যাক।

সরায়েভো হত্যাকাণ্ড: বারুদের গুদামে আগুনের এক ফুলকি
তারিখটি ছিল ১৯১৪ সালের ২৮ জুন। স্থান বতর্মান বসনিয়ার রাজধানী সরায়েভো। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ এবং তাঁর স্ত্রী সোফি গাড়ি করে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় ‘ব্ল্যাক হ্যান্ড’ নামক একটি সার্বিয়ান চরমপন্থী বিপ্লবী সংগঠনের সদস্য, ১৯ বছর বয়সী গ্যাভরিলো প্রিন্সিপ নামক এক তরুণ খুব কাছ থেকে গুলি করে এই রাজদম্পতিকে হত্যা করেন।
এই একটি হত্যাকাণ্ড ইউরোপের রাজনীতিতে ঠিক তেমন কাজ করেছিল, যেমনটা করে বারুদের গুদামে জ্বলন্ত এক কাঠি ছুঁড়ে দিলে হয়। অস্ট্রিয়া এই খুনের জন্য সরাসরি সার্বিয়াকে দায়ী করে এবং এক মাসের মাথায়, অর্থাৎ ২৮ জুলাই ১৯১৪ সালে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। আর এর পরপরই তাসখেলা বা ডমিনো ইফেক্টের মতো একে একে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
পর্দার পেছনের আসল চার খলনায়ক (M-A-I-N)
ঐতিহাসিকদের মতে, সরায়েভো হত্যাকাণ্ডটি ছিল কেবল একটি অজুহাত বা তাৎক্ষণিক কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আসল বীজ বোনা হয়েছিল আরও অনেক আগে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এটিকে ‘M-A-I-N’ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়:
১. Militarism বা সামরিকবাদ ও অস্ত্র প্রতিযোগিতা
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে এক উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, কার চেয়ে কার সামরিক বাহিনী বড় এবং কার অস্ত্র কত আধুনিক। বিশেষ করে গ্রেট ব্রিটেন এবং জার্মানির মধ্যে নৌবাহিনীর ক্ষমতা বাড়ানোর এক তীব্র প্রতিযোগিতা চলছিল। এই সামরিক শক্তির অহংকার দেশগুলোকে যেকোনো শান্তিসম্মত আলোচনার পথ থেকে দূরে ঠেলে দেয়।
২. Alliances বা গোপন সামরিক জোট
সে সময় ইউরোপের পরাশক্তিগুলো নিজেদের সুরক্ষায় গোপনে বা প্রকাশ্যে বিভিন্ন জোটে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে প্রধান দুটি জোট ছিল:
- ত্রিশক্তি মৈত্রী (Triple Entente): ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং রাশিয়া।
- ত্রিশক্তি চুক্তি (Triple Alliance): জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এবং ইতালি।
এই জোটগুলোর নিয়ম ছিল, যেকোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্য বন্ধুদেশগুলো তার পক্ষে যুদ্ধে নামতে বাধ্য। ফলে অস্ট্রিয়া যখন সার্বিয়াকে আক্রমণ করল, সার্বিয়ার রক্ষাকর্তা হিসেবে রাশিয়া এগিয়ে এল। আবার রাশিয়ার বিরুদ্ধে জার্মানি যুদ্ধ ঘোষণা করায় ফ্রান্স ও ব্রিটেনও যুদ্ধে যোগ দিল। এভাবে একটি আঞ্চলিক বিবাদ চোখের পলকে বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিল।
৩. Imperialism বা সাম্রাজ্যবাদ
এশিয়ার মসলা, আফ্রিকার সোনা আর খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে উপনিবেশ স্থাপনের এক নোংরা প্রতিযোগিতা চলছিল। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের দখলে ছিল বিশ্বের বিশাল অংশ, যা দেখে উদীয়মান পরাশক্তি জার্মানির মনে তীব্র হিংসা ও ক্ষোভের জন্ম নেয়। এই অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল।
৪. Nationalism বা উগ্র জাতীয়তাবাদ
“আমার দেশই সেরা এবং অন্য দেশকে ধ্বংস করা আমাদের অধিকার” – এমন এক উগ্র জাতীয়তাবাদী মানসিকতা তখন ইউরোপের মানুষের মনে বিষ ছড়িয়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে বলকান অঞ্চলে (যেখানে সার্বিয়া অবস্থিত) স্লাভ জাতির মানুষেরা অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের কবল থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন ‘বৃহৎ সার্বিয়া’ গড়ার স্বপ্নে বুঁদ ছিল, যা এই হত্যাকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি ছিল।
একনজরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ (১৯১৪-১৯১৮)
- স্থায়িত্ব: ৪ বছর ৩ মাস ২ সপ্তাহ।
- অংশগ্রহণকারী: বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশ প্রধান দুটি পক্ষে (মিত্রশক্তি বনাম অক্ষশক্তি) বিভক্ত হয়ে লড়েছিল।
- ক্ষয়ক্ষতি: প্রায় ২ কোটি সামরিক ও বেসামরিক মানুষের মৃত্যু এবং সমসংখ্যক মানুষ আহত হয়েছিল।
উপসংহার: ইতিহাসের এক চিরন্তন শিক্ষা
আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, শান্তি কতখানি ভঙ্গুর। এক রাজপুত্রের রক্তপাত থেকে শুরু হওয়া সেই বিশ্বযুদ্ধ কেবল কোটি মানুষের প্রাণই কেড়ে নেয়নি, বরং ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল অটোমান, রুশ আর অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ার মতো শতাব্দী প্রাচীন বিশাল সব সাম্রাজ্যকে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়েও যখন আমরা মধ্যপ্রাচ্য বা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, নতুন নতুন সামরিক জোট আর আধুনিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা দেখি, তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অহংকার, উগ্রতা আর কূটনীতির ব্যর্থতা কীভাবে মানুষের তৈরি এই সুন্দর পৃথিবীকে মুহূর্তের মধ্যে শ্মশানে পরিণত করতে পারে।

