
ফরাসি উপকূল থেকে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার সময় মানবপাচারকারীরা শিশুদের ঘুমের ওষুধ খাওয়াচ্ছে বলে তথ্য পেয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার৷
সলিসিটর জেনারেল লুসি রিগবি বলেছেন, ব্রিটিশ সরকার এই অপরাধ দমনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ৷ কারণ, অপরাধচক্রগুলো মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে৷
যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা রিগবি জানান, ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস (সিপিএস)-এর আইনজীবীদের সঙ্গে তার কথা হয়েছে৷ তারা তাকে জানিয়েছেন, চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার সময় শিশুরা যাতে যাত্রা বিঘ্ন হওয়ার মতো কোনো বাধা তৈরি না করে এবং তারা যেন সহযোগিতামূলক আচরণ করে, সেজন্য তাদের ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়৷
তিনি বলেন, ‘‘আমি সিপিএস-এর প্রসিকিউটরদের কাছেই জেনেছি পাচারকারীরা কতটা নিন্দনীয় কাজ করছে৷ তারা শুধু ছোট ছোট শিশুদের নৌকায় তুলেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, বরং তাদের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, যাতে তারা পারাপারের সময় বাধা না দেয়৷’’
হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের উপকূলে ছোট নৌকায় সবশেষ অভিবাসীরা এসেছেন গত ২৬ আগস্ট৷ ওই দিনের পর এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অভিবাসীবাহী আর কোনো নৌকা আসেনি৷
চলতি বছর এখন পর্যন্ত ২৯ হাজারের বেশি অভিবাসী ছোট নৌকায় করে দেশটিতে পৌঁছেছেন৷
এমন প্রেক্ষাপটে লেবার পার্টির এমপি অ্যালেক্স ব্যালিঞ্জার (হেলসওয়েইন) বলেন, “এই বিপজ্জনক পারাপারে জড়িত পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছি, যারা নারী ও শিশুদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে৷ সলিসিটর জেনারেল কি বলতে পারেন, তিনি কীভাবে এই আমাদের পদক্ষেপকে সহযোগিতা করছেন?”
জবাবে রিগবি বলেন, ‘‘তিনি ঠিকই বলেছেন, মানুষ—বিশেষ করে শিশুরা—চ্যানেল পার হওয়ার সময় যে বিপদের মুখোমুখি হয় তা অত্যন্ত গুরুতর৷ এই সরকার পাচারকারীদের ব্যবসার মডেল ভেঙে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যাতে আমাদের সীমান্ত রক্ষা করা যায় এবং মানুষের জীবন—বিশেষ করে শিশুদের জীবন—এই ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা করা যায়৷’’
ইংলিশ চ্যানেলে নৌকা থামাতে সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও তাতে সমালোচনা বন্ধ হচ্ছে না৷ অভিবাসন ইস্যুতে বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি কঠোর সমালোচনা করেই যাচ্ছে৷ জনমনে ক্ষোভ উসকে দিয়ে জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে নিচ্ছে কট্টর ডানপন্থি দল রিফর্ম ইউকে৷
এমপিদের উদ্দেশে রিগবি বলেন, সরকার আশ্রয় আবেদন বাতিল হওয়া ৩৫ হাজার ব্যক্তিকে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে অনিয়মিত অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর হার ৩০ শতাংশ বেড়েছে৷
তিনি আরো জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যে অনিয়মিত অভিবাসনে সহযোগিতার অভিযোগে দায়ের করা মামলার সংখ্যাও বেড়েছে ৬৭ শতাংশ৷
“মানবপাচারের মতো জঘন্য ব্যবসায় জড়িত যে কোনো ব্যক্তি আইনে উল্লেখিত সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হবে’’, বলেও এমপিদের আশ্বস্ত করেছেন সলিসিটর জেনারেল৷
লুসি রিগবি বলেন, ‘‘আমাদের পদক্ষেপ নিয়ে বিরোধী দল সমালোচনা করছে, কিন্তু তারাই আমাদের এই সীমান্ত সংকটের মধ্যে ফেলে গেছেন৷ আর রিফর্ম পার্টি শুধু ক্ষোভ উসকে দিচ্ছে, কিন্তু কোনো সমাধান দিতে পারছে না৷’’
আগামী ১০ সেপ্টেম্বর স্কাই নিউজে অভিবাসন ইস্যুতে বিতর্কে অংশ নেবে সরকারি দল লেবার পার্টি, বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি, অতি ডানপন্থি ফার-রাইট রিফর্ম ইউকে এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাট৷
তবে টোরিদের ছায়া সলিসিটর জেনারেল হেলেন গ্র্যান্ট বলেন, ‘‘আমি সলিসিটর জেনারেলের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নই, বিশেষ করে গত সরকারের রেকর্ড নিয়ে তার মন্তব্যের ক্ষেত্রে৷ আমি মনে করি, তাদের সরকারের গত ১২ মাসের রেকর্ডের পরিপ্রেক্ষিতে দেয়া তার বক্তব্য কিছুটা অতিরঞ্জিত৷’’
এদিকে, ইংলিশ চ্যানেলে অভিবাসীবাহী নৌকা থামাতে মরিয়া ব্রিটিশ সরকার৷ চলতি বছরের ১০ জুলাই নতুন একটি চুক্তিতে সই করেছে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য৷ এই পাইলট প্রকল্পটির নাম ‘ওয়ান ইন, ওয়ান আউট৷’
চুক্তি নিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, ‘‘আমরা প্রত্যাবাসন সম্পর্কিত একটি যুগান্তকারী পাইলট প্রকল্পের চুক্তিতে সই করেছি৷ এর আওতায়, ছোট নৌকায় আসা অভিবাসীদের আটক করে অল্প সময়ের মধ্যে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হবে৷
একজনকে ফেরত পাঠানোর বিনিময়ে, অপর একজন অভিবাসীকে ফ্রান্স থেকে নিরাপদে যুক্তরাজ্যে আসার অনুমতি দেয়া হবে৷ প্রক্রিয়াটি হবে নিয়ন্ত্রিত এবং আইনি পথে কঠোর নিরাপত্তা তল্লাশির মধ্য দিয়ে৷ এই সুযোগ তারাই পাবেন, যারা অনিয়মিত পথে যুক্তরাজ্যে ঢোকার চেষ্টা করেননি৷’’
৫ আগস্ট এই চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন এবং ইইউর সদস্য দেশগুলো৷ ৬ আগস্ট থেকে চ্যানেল পেরিয়ে আসা অভিবাসীদের আটক করা শুরু করে যুক্তরাজ্য৷ পরদিন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেন, ‘‘আজ আমি নিশ্চিত করছি, পাইলট প্রকল্পটি শুরু হয়েছে এবং ছোট নৌকায় আসা অভিবাসীদের আটক করা হচ্ছে৷ তাদের অভিবাসী অপসারণ কেন্দ্রে স্থানান্তরের কাজ চলছে৷’’
এই সপ্তাহের শুরুর দিকে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, চলতি মাস থেকেই আটক করা অভিবাসীদের ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটি শুরু হবে৷ সূত্র : ইনফোমাইগ্রেন্টস

