
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী ফ্রঁসোয়া বাইরু এবার সরাসরি হাত দিয়েছেন স্টেট মেডিকেল এইড বা রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা সহায়তা (এএমই)-এর ওপর৷ সরকারের পরিকল্পনা হলো অনথিভুক্ত অভিবাসীদের জন্য চিকিৎসা সুবিধা সংকুচিত করা৷
সরকারের লক্ষ্য, এএমই এর আওতায় থেরাপির মতো বিভিন্ন সুবিধা বাদ দেয়া৷
এমন ঘোষণাকে ‘অশোভন’ বলে মন্তব্য করেছে বৃহত্তর প্যারিসে সামাজিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান কমেড৷ তারা বলছে, সরকার অভিবাসী ও শরণার্থীদের ‘অন্যায়ভাবে সুবিধাভোগী’ হিসেবে তুলে ধরছে৷
বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিএফএম টিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সরকারের এমন সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী ফ্রঁসোয়া বাইরু৷ তিনি বলেন, “আপনি যখন ফরাসিদের কাছে কৃচ্ছ্রসাধনের আহ্বান জানাচ্ছেন, তখন তারা যেন মনে না করে যে শুধু তারাই ত্যাগ স্বীকার করছে৷ আর অন্যরা করছে না৷ ফ্রান্সে বসবারত বিদেশিদেরও এই প্রচেষ্টার অংশীদার হতে হবে৷’’
যদিও আগামী ৮ সেপ্টেম্বর সংসদে অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী৷ ওইদিন সরকারের পতন হতে পারে বলে জোর গুঞ্জন আছে৷
অনাস্থা ভোটের মাত্র দিন কয়েক আগে এএমই নিয়ে এমন ঘোষণা দিয়ে মূলত ডানপন্থি রাজনৈতিক মহলকে আশ্বস্ত করতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী৷
তিনি বলেন, এএমই-এর তালিকায় বালনোথেরাপির মতো সেবা ছিল৷ এটা স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গতও নয় যে রাষ্ট্র তার নাগরিক ও বিদেশিদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে ন৷
যেসব পরিবর্তন আসছে
প্রস্তাবনার একটি খসড়া অধ্যাদেশ ইনফোমাইগ্রেন্টসের হাতে এসেছে৷ সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে ‘‘বালনোথেরাপিতে করা পুনর্বাসন চিকিৎসা’’ এএমই-এর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে৷
অথচ বর্তমানে সামাজিক কর্ম ও পরিবার বিষয়ক আইনে এএমই ভোগীদের জন্য নির্ধারিত চিকিৎসার তালিকায় এই শব্দ নেই৷ বরং সেখানে রয়েছে ‘‘মাসো-কিনেসিওথেরাপি’’ বা ফিজিওথেরাপির মতো সেবা, যার মধ্যে অনেক সময় বালনোথেরাপিও পড়ে৷
অর্থাৎ সরকার চাইছে এসব ফিজিওথেরাপি বা ম্যাসাজভিত্তিক চিকিৎসা বাদ দিয়ে ব্যয় কমাতে৷ যদিও বিষয়টি নতুন নয়৷ ২০০০ সালের পর থেকেই এএমই সুবিধার নানা চিকিৎসা ধাপে ধাপে বাদ দেওয়া হচ্ছে৷ এর মধ্যে রয়েছে থার্মাল কিউর, প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোরদের আবাসন খরচ, শিশুদের দাঁতের বিশেষ চেকআপ কিংবা টেস্টটিউব বেবি (পিএমএ) সেবা৷ এগুলোর পুরো খরচ বহন করতে হচ্ছে রোগীকেই৷
এনজিওগুলোর সমালোচনা
চিকিৎসা ও সামাজিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কমেড-এর আইনি ও সামাজিক বিভাগের সমন্বয়ক দিদিয়ে মাই বলেন, “বালনোথেরাপির প্রসঙ্গ তোলা আসলে প্রহসন। এতে করা বোঝানো হচ্ছে অনথিভুক্তরা বিলাসবহুল স্পা-তে যায়! বাস্তবে তারা বেঁচে থাকার সংগ্রামে দিন কাটায়।”
তার মতে, সরকারের এই অবস্থান অভিবাসীদের বারবার কলঙ্কিত করছে, যেন তারা ফ্রান্সে এসে আরাম করে সুবিধা ভোগ করছে। গরিব ও প্রান্তিক মানুষদেরকে সিস্টেমের ভুয়া সুবিধাভোগী হিসেবে তুলে ধরে তাদের চিকিৎসার পথ বন্ধ করার এটি আরেকটি প্রচেষ্টা।
কারা চিকিৎসা সহায়তা পেতে পারে?
ফ্রান্সে অভিবাসীর অবস্থানের ধরন অনুযায়ী স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে।
- এএমই : অনিয়মিত অভিবাসীরা অন্তত তিন মাস ধরে ফ্রান্সে বসবাস করলে এবং তাদের আয় মাসে ৮০০ ইউরোর কম হলে এ সুবিধা পান। এএমই কার্ডের মাধ্যমে আসা রোগীদের চিকিৎসকেরা চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করতে পারেন না। বেশিরভাগ ওষুধও বিনামূল্যে মেলে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের সব ধরনের চিকিৎসার খরচ রাষ্ট্র বহন করে।
- সিএসএস: নিয়মিতভাবে ফ্রান্সে অন্তত তিন মাস বসবাস করলে এবং মাসিক আয় ৮০০ ইউরোর কম হলে অভিবাসীরা এই বিনামূল্যের স্বাস্থ্যবীমা পেতে পারেন৷ রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী বা শরণার্থীদের জন্য তিন মাস বসবাসের শর্ত শিথিলযোগ্য৷
- জরুরি স্বাস্থ্যসেবা (পাস): যাদের কোনো স্বাস্থ্যবীমা নেই বা এএমই/সিএসএস আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন, তারা সরকারি হাসপাতালের এই বিশেষ কেন্দ্রগুলো থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসা পেতে পারেন।
জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি?
এএমই সীমিত করার পদক্ষেপকে “অযৌক্তিক” বলছে ডাক্তার সংগঠনগুলোও। গত বছর মেদসাঁ দ্যু মোন্দের সমন্বয়ক মাথিয়্যো কিনেতে সতর্ক করেছিলেন, “যদি অভিবাসীদের চিকিৎসা সুবিধা না দেওয়া হয়, তারা অসুস্থ হয়ে পড়বে। আর তারা অসুস্থ হলে সাধারণ জনগণও ঝুঁকিতে পড়বে। ফলে সরকারি হাসপাতালগুলো রোগীতে উপচে পড়বে।”
এএমই খাতে প্রতিবছর প্রায় ১০২ কোটি ইউরো খরচ হয়, যা ফ্রান্সের স্বাস্থ্য ব্যয়ের মাত্র ০.৪ শতাংশ। এই হার বহু বছর ধরে অপরিবর্তিত।
ফলে এটি পুরো রাষ্ট্রীয় বাজেটের তুলনায় সামান্যই। আর মনে রাখতে হবে, এ সুবিধাভোগী চার লাখ ৬৬ হাজার মানুষ৷ যা মোট জনসংখ্যার এক শতাংশেরও কম।

