ক্যানসার চিকিৎসার ইতিহাসে যুক্ত হলো এক নতুন মাইলফলক। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হাজারো রোগীর জন্য চিকিৎসার এক নতুন ও সহজ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে আধুনিক ইমিউনোথেরাপি। প্রচলিত নিয়মে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে শিরায় (আইভি) ওষুধ নেওয়ার যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এখন মাত্র সাত মিনিটে ত্বকের নিচে ইনজেকশনের মাধ্যমেই দেওয়া যাবে ক্যানসারের ওষুধ। বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রোশ ফার্মা ইন্ডিয়া (Roche Pharma India) বাজারে নিয়ে এসেছে ‘টিসেনট্রিক’ নামের এই যুগান্তকারী ইনজেকশন। তবে এই আধুনিক চিকিৎসার কার্যকারিতা যেমন আশা জাগাচ্ছে, তেমনি এর আকাশচুম্বী খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় উদ্বেগ।

‘টিসেনট্রিক’ কীভাবে কাজ করে? রোগের বিরুদ্ধে শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, এই থেরাপিতে মূলত ‘অ্যাটেজোলিজুম্যাব’ (Atezolizumab) নামের একটি বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কৃত্রিমভাবে শক্তিশালী করে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে উদ্দীপিত করে।
বিজ্ঞানের সহজ সমীকরণ: PD-L1 প্রোটিন ব্লক
ক্যানসার কোষগুলো সাধারণত মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার চোখ ফাঁকি দিতে PD-L1 নামের একটি বিশেষ প্রোটিন ব্যবহার করে। নতুন এই ইমিউনোথেরাপি ইনজেকশনটি ওই প্রোটিনকে ব্লক বা বন্ধ করে দেয়। ফলে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধক কোষগুলো ক্যানসারকে সহজেই শনাক্ত করতে পারে এবং সেগুলোকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে। যেসব রোগীর টিউমারে এই প্রোটিনের মাত্রা বেশি, তাদের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
নন-স্মল সেল লাং ক্যানসার (NSCLC) রোগীদের জন্য বড় স্বস্তি
এই নতুন ইনজেকশনটি মূলত নন-স্মল সেল লাং ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের জন্য তৈরি, যা ভারত ও বাংলাদেশে ফুসফুসের ক্যানসারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট হাসপাতালের অনকোলজিস্টদের মতে, বিশ্বজুড়ে ক্যানসার চিকিৎসায় ইমিউনোথেরাপির ব্যবহার ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। ভারত, চীন, জাপান ও সৌদি আরবসহ বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশে এই চিকিৎসা সফলভাবে অনুমোদিত ও ব্যবহৃত হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকার পরিবর্তে মাত্র ৭ মিনিটে ইনজেকশন দেওয়ার এই পদ্ধতি একদিকে যেমন রোগীদের মানসিক ও শারীরিক ভোগান্তি কমাবে, অন্যদিকে হাসপাতালের ওপর থেকেও অতিরিক্ত চাপ হ্রাস করবে।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: ইমিউনোথেরাপি নতুন কিছু নয়
ভারতে এই সাবকিউটেনিয়াস (ত্বকের নিচে দেওয়ার) ইনজেকশনটি নতুন আলোড়ন তৈরি করলেও, সামগ্রিকভাবে ইমিউনোথেরাপির ব্যবহার বাংলাদেশে বেশ আগে থেকেই চলছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (BMU) ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন এই প্রসঙ্গে জানান, বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসায় ইমিউনোথেরাপি অনেক আগে থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনায় এই ইমিউনোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে রোগীরা শারীরিকভাবে বেশ স্বস্তিতে থাকেন এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।
বড় বাধা যেখানে: চিকিৎসার আকাশচুম্বী ব্যয়
যুগান্তকারী এই চিকিৎসার সবচেয়ে বড় অন্ধকার দিক হলো এর অতিরিক্ত উচ্চমূল্য। ভারতীয় বাজারে এই ইনজেকশনের প্রতি ডোজের দাম প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার রুপি। চিকিৎসকদের মতে, একজন রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করতে সাধারণত অন্তত ছয়টি ডোজের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে পুরো চিকিৎসার খরচ দাঁড়াবে প্রায় ২২ থেকে ২৫ লাখ রুপি (বা সমপরিমাণ টাকা)।
“ইমিউনোথেরাপির মতো আধুনিক চিকিৎসা নিঃসন্দেহে কার্যকর, কিন্তু এর বিশাল ব্যয়ভার মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে বহন করা অসম্ভব। ফলে অনেক রোগী শুধুমাত্র অর্থের অভাবে এই জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।”
উপসংহার: প্রয়োজন সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ
চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই অগ্রগতি মানবজাতির জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ। কিন্তু সেই আশীর্বাদ যদি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকে, তবে তার পূর্ণ সুবিধা সমাজ পায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির এই আধুনিক ইমিউনোথেরাপি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা দরকার, যেন তারা ওষুধের দাম কমায়। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশগুলোতে ক্যানসার চিকিৎসায় সরকারি ভর্তুকি এবং স্বাস্থ্যবীমার আওতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

