কল্পনা করুন এমন এক পৃথিবীর, যেখানে কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি দেশ একে অপরের দিকে তাক করে রেখেছে হাজার হাজার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র। কিন্তু সেই মারণাস্ত্রের সংখ্যা কত বা সেগুলো কখন মোতায়েন করা হচ্ছে, তা জানার কোনো আইনি পথ আর খোলা নেই। গত বুধবার মধ্যরাতে বিশ্ব ঠিক সেই বিপজ্জনক মোড়েই এসে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে টিকে থাকা সর্বশেষ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’-এর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এর ফলে স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী কয়েক দশকের আপেক্ষিক শান্তির অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব কি নতুন এক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে যাচ্ছে? এই প্রশ্নই এখন বিশ্ববাসীর মনে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
‘নিউ স্টার্ট’ কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
২০১০ সালে চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এটি ছিল ১৯৯১ সালের ‘স্টার্ট’ (START) চুক্তির উত্তরসূরি।

চুক্তির মূল শর্তাবলি
- সীমাবদ্ধতা: উভয় দেশ সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৫০টি কৌশলগত পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করতে পারত।
- স্বচ্ছতা: দুই দেশ একে অপরের পারমাণবিক ঘাঁটি পরিদর্শন এবং তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ পেত।
- নিরাপত্তা: এই চুক্তির ফলে কোনো পক্ষই হঠাৎ করে বড় ধরনের কোনো পারমাণবিক প্রস্তুতি নিতে পারত না, যা একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধ প্রতিরোধে ঢাল হিসেবে কাজ করত।
কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার ফলে এই কাঠামোটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।
জাতিসংঘ ও বিশ্বনেতাদের উদ্বেগ
চুক্তিটির সমাপ্তিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য এক ভয়ংকর মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি এখন কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
পোপ লিও থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই শূন্যতা অস্ত্র প্রতিযোগিতার লাগামহীন দৌড় শুরু করবে। যখন কোনো আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা থাকে না, তখন প্রতিটি দেশ নিজেকে নিরাপদ রাখতে পাল্লা দিয়ে মারণাস্ত্র বাড়াতে শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত একটি বৈশ্বিক ধ্বংসযজ্ঞের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ট্রাম্প ও পুতিনের অবস্থান: কূটনীতি না কি শক্তি প্রদর্শন?
এই চুক্তির সমাপ্তিতে দুই পরাশক্তির রাষ্ট্রপ্রধানদের অবস্থানে ভিন্নতা লক্ষ করা গেছে।
রাশিয়ার কঠোর হুঁশিয়ারি
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যদিও আগে থেকেই এই চুক্তি স্থগিত করেছিলেন, কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা আর কোনো বাধ্যবাধকতা মানবে না। দিমিত্রি মেদভেদেভ তো আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘এই পরিস্থিতি দেখে সবার আতঙ্কিত হওয়া উচিত।’ রাশিয়া এখন নিজের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় যেকোনো ‘সামরিক ও প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ’ নিতে স্বাধীন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ভালো চুক্তি’র স্বপ্ন
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন। তিনি মনে করেন, পুরনো চুক্তির চেয়ে একটি ‘আরও ভালো চুক্তি’ করার সময় এসেছে। ট্রাম্পের দৃষ্টি এখন শুধু রাশিয়ার দিকে নয়, বরং চীনের দিকেও।

চীন ফ্যাক্টর: কেন যুক্তরাষ্ট্র নতুন শর্ত দিচ্ছে?
ওয়াশিংটন মনে করে, বর্তমানে যেকোনো পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে চীনকে অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। চীন গত কয়েক বছরে দ্রুতগতিতে তাদের পারমাণবিক ভাণ্ডার বাড়াচ্ছে। জার্মানি এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোও সুর মিলিয়ে বলছে যে, চীনকে ছাড়া শুধু দুই দেশের চুক্তি বর্তমান বিশ্বের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে না।
তবে এর বিপরীতে রাশিয়ার দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, যদি চীনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে ন্যাটোভুক্ত দেশ ফ্রান্স ও ব্রিটেনকেও চুক্তির আওতায় আনতে হবে, যারা নিজেরাও পারমাণবিক শক্তির অধিকারী। এই ‘মাল্টি-ল্যাটারাল’ বা বহুপাক্ষিক চুক্তির জটিলতাই মূলত নতুন কোনো সমঝোতাকে অসম্ভব করে তুলছে।
হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ‘গোল্ডেন ডোম’: নতুন প্রযুক্তির লড়াই
পুরনো চুক্তি বাতিলের সাথে সাথে শুরু হয়েছে উন্নত প্রযুক্তির মারণাস্ত্র তৈরির হিড়িক।
- হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র: যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে যা ঘণ্টায় ৬ হাজার কিলোমিটারের বেশি বেগে ছুটতে পারে। এগুলোকে ভূপাতিত করা বর্তমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রায় অসম্ভব।
- গোল্ডেন ডোম: ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী আমেরিকাকে রক্ষায় একটি বিশাল প্রতিরক্ষা ঢাল বা ‘গোল্ডেন ডোম’ তৈরির চিন্তা রাশিয়াকে আরও ক্ষুব্ধ করেছে। এর পাল্টা হিসেবে রাশিয়া ‘বুরেভেস্তনিক’-এর মতো পারমাণবিক শক্তিচালিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং সমুদ্রের নিচ দিয়ে হামলা চালানোর টর্পেডো তৈরি করছে।
ভেঙে পড়া নিরাপত্তা কাঠামো এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি
কেবল নিউ স্টার্ট চুক্তিই নয়, গত কয়েক বছরে একের পর এক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি বাতিল হয়েছে। ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস অ্যাগ্রিমেন্ট (INF) এবং ওপেন স্কাইস ট্রিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলো এখন ইতিহাস। যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক প্রধান অ্যাডমিরাল স্যার টনি রাডাকিন সতর্ক করেছেন যে, বিশ্বকে নিরাপদ রাখার পুরো কাঠামোটিই এখন ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব কী হতে পারে?
তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কোনো দেশ ভুলবশত অন্য দেশের সাধারণ সামরিক মহড়াকে পারমাণবিক হামলা ভেবে পাল্টা হামলা চালাতে পারে। অস্ত্র প্রতিযোগিতার কারণে দেশগুলো জনকল্যাণমূলক খাতের টাকা সামরিক খাতে ব্যয় করতে বাধ্য হবে। ছোট ও মাঝারি শক্তিশালী দেশগুলোও নিজেদের পারমাণবিক শক্তি অর্জনে উৎসাহিত হবে।
ইগো আর ক্ষমতার লড়াই : উদ্যোগ নিতে হবে বিশ্বনেতাদের
নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো প্রতিটি দেশের অধিকার হতে পারে, কিন্তু সেই সক্ষমতা যদি মানবজাতিকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দেয়, তবে তো আর জয়ী কেউ থাকে না। নিউ স্টার্ট চুক্তির অবসান শুধু একটি কাগজের চুক্তির ইতি নয়, বরং এটি একটি বিপজ্জনক ও অনিশ্চিত যুগের সূচনা। বিশ্বনেতারা কি পারবেন ইগো আর ক্ষমতার লড়াই সরিয়ে রেখে নতুন একটি কাঠামো তৈরি করতে? না কি ইতিহাস আমাদের আবারও সেই হিরোশিমা-নাগাসাকির ছাইয়ের নিচে নিয়ে যাবে? উত্তরটি সময়ের গর্ভে থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতি যে অত্যন্ত সংবেদনশীল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

