মো. আবুল হাসান ও খন রঞ্জন রায় :: নগরকেন্দ্রিক জীবনকে কেন্দ্র করে আজ হতে বহু বছর পূর্বে প্রাচীন গ্রীসে গণতন্ত্রের জন্ম। প্রাচীন গ্রীসে জনসংখ্যা কম ছিল বলে প্রত্যেকে শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করতেন এবং তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব মতামত, পরামর্শ ও উপদেশের ভিত্তিতে পরিচালিত হত নগর জীবন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির ফলে তাদের প্রত্যেকের পে শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করা দুরুহ ও জটিল হয়ে পড়ে। তাই জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শুরু হয় গণতান্ত্রিক শাসনের যাত্রা। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় গত ১৫ জুন ২০১৩ অনুষ্ঠিত হয়েছে খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। ৬ জুলাই হয় নবগঠিত দেশের দেশের ১১ তম সিটি কর্পোরেশন গাজীপুরে। চার সিটিতে মোট ভোটাদাতার সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ২৯ হাজার ৭৮৬জন। আর গাজীপুরে ছিল ১০লাখ ২৬ হাজার ৯৩৮ ভোট।
নির্বাচনে জয় পরাজয় ছাপিয়ে যে দিকটি বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে তা হল গণতান্ত্রিক চরিত্র। সবদিক থেকেই এ নির্বাচন ছিল গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। প্রথমত, নির্বাচনের আগে পরে কোনো ধরণের সহিংসতা ঘটেনি। পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেই বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা বিপুল ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থীদের পরাজিত করেছেন। বিএনপি সমর্থিত বিজয়ী পাঁচ মেয়রপ্রার্থী ভোট পেয়েছেন মোট আট ৬৮ হাজার ৩৮৭ আওয়ামী লীগ সমর্থিত পাঁচ মেয়র প্রার্থী পেয়েছেন মোট ৬ লাখ ৬২০। বিজয়ী প্রার্থী পরাজিত প্রার্থীদের চেয়ে দেড় গুণের বেশি ভোট পেয়েছেন। ৫ সিটি কর্পোরেশন কাউন্সিলর পদের মধ্যে ৯০ টি পেয়েছে বিএনপি, ৫৬ টি আওয়ামী লীগ, ৬ টি জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী শাসনতন্ত্র ১ এবং স্বতন্ত্র ১৪টি।
দৈনিক কালের কন্ঠের অনুসন্ধানে দেখা যায় ৫ সিটি কর্পোরেশন নির্বাাচনে যে ১৭৩ জন সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন তাদের মধ্যে ৮৭ জনের বিরুদ্ধেই হত্যা, হত্যাচেষ্টা, চাদাবাজি, সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্রসহ নানা অভিযোগে মামলা ছিল বা আছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য মতে, তাদের অনেকেই ভয়ংকর প্রকৃতির। গুরুতর সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে অনেকেই জড়িত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, এ ধরণের ব্যক্তির জনপ্রতিনিধি হিসাবে বিজয়ী হওয়া শুভ লণ নয়।
নিব্র্াচনী প্রচার অভিযানে মেয়র প্রার্থীদের ইশতেহারে আরও আধুনিক নগর প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্র“তি ছিল। নির্বাচনের পূর্বে প্রতিশ্র“তির বন্যা বয়ে যায়। কেনো পূর্বপ্রস্তুতি কিংবা পূর্ব ধারণা ছাড়াই প্রার্থীরা একের পর এর প্রতিশ্র“তি দিয়ে যায়। নির্বাচরে পর সেসব প্রতিশ্র“তি পালন করার েেত্র কোনো সমস্যা আছে কিনা তা ভাবেন না। এই নির্বাচনে উল্লেখ্যযোগ্য বিষয় ছিল ৫টি সিটি কপোরেশন এর ১৯ জন মেয়র প্রার্থীর নির্বাচনী
ইশতেহারে একই রকম সম্মিলিত দফা ছিল ৬টি
একক দফাসমূহ হল
(ক) নগর বাসীকে আধুনিক চিকিৎসা প্রদান করা।
(খ) শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন করা।
(গ) আধুনিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা।
(ঘ) বেকারত্ব দূরীকরণে পদপে গ্রহণ করা।
(ঙ) নগরকে সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করা
(চ) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন করা।
উল্লেখিত ৬টি দফার সাথে ডিপ্লোমা প্রযুক্তি শিার রয়েছে সুগভীর সর্ম্পক। দফাসমূহ বাস্তবায়নে বিগত নির্বাচিত মেয়রগণ ব্যর্থ হওয়ার মূলে রয়েছে উপনিবেশিক আমলের গড়ে ওঠা ডিপ্লোমা শিা ব্যবস্থা। নগর বাসীর চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিতি দ জনবল গড়ে তুলতে পারেননি গেল নগর পিতাগণ।
ব্যর্থতার খতিয়ান খুলতে গিয়ে অবতারণা করতে হয় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তথ্য উপাত্ত। ২০১০ সালের ১৭ জুন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। চট্টগ্রামের উন্নয়নে ৫৬ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিল নির্বাচিত মেয়র এম মনজুর আলম। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ২৩ কোটি টাকার ব্যয়ে আনিত প্লান্ট শুধুমাত্র প্রশিতি জনবলের অভাবে ভেস্তে যাচ্ছে। দীর্ঘ তিন বছরে এ ব্যপারে কোন অগ্রগতি সাধিত হয়নি।
বর্তমান বাংলাদেশের নগর গুলোর চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর কোন মহল আস্থা রাখতে পারছেনা। চিকিৎসার প্রথম ও প্রধান শর্ত সঠিক রোগ নির্ণয়। প্রশিতি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এর অভাবে রোগনির্ণয় ও সঠিক ব্যবস্থাপনা হচ্ছে না। কিনিক গুলোতে ডিপ্লোমা নার্সের অভাবে আয়াদের সাদা কাপড় পরিয়ে নার্স বানানোর হয়। প্রশিতি জনবলের অভাবে প্রতিষ্ঠিত শিল্প গুলো মৃত্যুবরণ করছে। দেশি বিদেশী বিনিয়োগকারীরা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়তে গিয়ে দ জনবলের অভাব উপলব্ধি করছেন।
বাংলাদেশে শিা েেত্র সবচেয়ে বেশি গোঁজামিল ও অপচয় হয়। প্রতি বছর ৭ টি বিভাগীয় শহর তথা সিটি কর্পোরেশন এলাকা থেকে ৬ ল শিার্থী এসএসসি পরীা উর্ত্তীর্ণ হয়ে দিক নির্দেশনাহীণ হয়ে পড়ে। উন্নত বিশ্বে নগর গুলোতে জণগোষ্ঠীর অধিকাংশ শিার্থীকে ডিপ্লোমা শিায় শিতি করে গড়ে তোলে। তাদের দেশে যেখানে হাইস্কুল আছে তারই পার্শে নির্মাণ করা হয়েছে ডিপ্লোমা শিা ইনস্টিটিউটভ।
উন্নত বিশ্বের ন্যায় এদেশের এসএসসি পাশ তরুণদের পেশা ও পণ্যভিত্তিক ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যয়নের সুযোগ সৃষ্টি করা উচিৎ। তাহলে হাসপাতল, কিনিক, শিল্পে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ডিপ্লোমাধারীদের নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। নবনির্বাচিত নগর পিতারা তাদের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করতে হলে ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট নির্মাণ বি¯তৃতি ঘটাতে হবে। নির্বাচনী ইশতেহারে বাস্তবায়নে শক্তিশালী হাতিয়ারের ভূমিকা পালন করবে ডিপ্লোমা প্রযুক্তিবিদগণ। জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত মেয়রদের ব্যর্থতা আমরা আর দেখতে চাইনা। একক নির্বাচনী ইশতেহারের গুরুত্ব উপলব্ধি করে সকল প্রার্থীর প্রতি রইল আন্তরিক অভিনন্দন।
মো. আবুল হাসান, সভাপতি
খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব
ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।
৪৭, মতি টাওয়ার, চকবাজার, চট্টগ্রাম।
