বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম সারাহ বেগম কবরী। যার ডাগর চোখের মায়ায় আর ভুবনভোলানো হাসিতে কয়েক প্রজন্ম বুঁদ হয়েছিল। ২০২১ সালের ১৭ এপ্রিল রুপালি পর্দার এই নক্ষত্র পাড়ি জমিয়েছিলেন অনন্তের পথে। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে ফিরে দেখা এই কালজয়ী অভিনেত্রীর জীবনের কিছু জানা-অজানা গল্প।

মিনা পাল থেকে ‘মিষ্টি মেয়ে’
১৯৫০ সালে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে জন্ম নেওয়া মিনা পাল হয়ে ওঠেন সারাহ বেগম কবরী। মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হলেও ১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মাত্র ১৪ বছর বয়সে বড় পর্দায় অভিষেক হয়। তাঁর সহজাত অভিনয় আর মিষ্টি হাসির কারণে দর্শক ভালোবেসে তাঁকে নাম দেয় ‘মিষ্টি মেয়ে’।
পাঁচ নায়কের প্রথম নায়িকা: এক অনন্য রেকর্ড
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কবরীই একমাত্র অভিনেত্রী, যাঁর হাত ধরে ঢাকাই সিনেমার পাঁচজন দিকপাল নায়কের অভিষেক হয়েছিল। তাঁরা হলেন – উজ্জ্বল, ফারুক, আলমগীর, সোহেল রানা ও জাফর ইকবাল। এছাড়া নায়ক রাজ্জাকের সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল বাংলা সিনেমার এক সোনালী যুগের প্রতীক।
চলচ্চিত্রের সীমানা পেরিয়ে এক দেশপ্রেমিক
কবরী কেবল পর্দার চিত্রনায়িকাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে ভারতে গিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরি করেন। দেশপ্রেমের সেই দায়বদ্ধতা তিনি আমৃত্যু পালন করেছেন, যা তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

অভিনয়ের পাশাপাশি নির্মাণ ও রাজনীতি
পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে শতাধিক ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি কবরী পরিচালনাতেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০০৫ সালে ‘আয়না’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে তাঁর অভিষেক হয়। পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন এবং ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর আত্মজীবনী ‘স্মৃতিটুকু থাক’ বইয়ে তিনি জীবনের অনেক না বলা কথা তুলে ধরেছেন।
অপূর্ণ স্বপ্ন ও চিরবিদায়
কবরীর জীবনের একটি বড় স্বপ্ন ছিল বলিউড শাহেনশাহ অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে অভিনয় করা, যা শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে যায়। ২০২১ সালের ১৭ এপ্রিল করোনা আক্রান্ত হয়ে ৭১ বছর বয়সে তিনি বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন। সহকর্মী সোহেল রানার ভাষায়, “শত বছরে একজন কবরীই জন্মায়।”
উপসংহার
কবরী কেবল একজন অভিনেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালি নারীর চিরায়ত রূপ ও শক্তির প্রতীক। পর্দার সেই মায়াবী চোখ আর মায়াবী হাসি আজও আমাদের সিনেমা অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁকে মনে রাখবে তাঁর সাবলীল অভিনয় এবং শিল্পের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসার জন্য।

