হলিউডের ইতিহাসে এমন অভিনেত্রী খুব কমই আছেন, যাঁকে একাধারে ‘বিউটি আইকন’, ‘মিলিয়ন ডলার অ্যাক্ট্রেস’ এবং ‘মানবিক যোদ্ধা’ বলা যায়। এলিজাবেথ টেইলর ছিলেন ঠিক তেমনই একজন। ১৯৩২ সালের এই দিনে লন্ডনে জন্ম নেওয়া এই অভিনেত্রী তাঁর ৭৯ বছরের জীবনে যা দেখে গেছেন, তা কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। রুপালি পর্দায় তিনি যতটা সফল ছিলেন, ব্যক্তিগত জীবনে ততটাই ছিলেন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ।
শৈশব থেকেই নক্ষত্র: ‘ন্যাশনাল ভেলভেট’ ও উত্থান
মাত্র ১০ বছর বয়সে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো এলিজাবেথ ১২ বছর বয়সেই ‘ন্যাশনাল ভেলভেট’ (১৯৪৪) দিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান। ঘোড়দৌড়ের সেই সিনেমার শুটিংয়ে পড়ে গিয়ে তাঁর শিরদাঁড়ার হাড় ভেঙে যায়, যা সারাজীবন তাঁকে শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগিয়েছে। তবুও দমে যাননি তিনি; কিশোরী তারকা থেকে দ্রুতই রূপান্তর ঘটে হলিউডের প্রধান নায়িকায়।

আটটি বিয়ে এবং সাতটি বিচ্ছেদ
এলিজাবেথ টেইলরের ব্যক্তিগত জীবন ছিল মিডিয়ার সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। ১৯৫০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি সাতজন ব্যক্তিকে মোট আটবার বিয়ে করেন।
- প্রথম বিয়ে: ১৮ বছর বয়সে হোটেল টাইকুন কনরাড হিলটন জুনিয়রকে।
- রিচার্ড বার্টন অধ্যায়: তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত প্রেম ও বিয়ে ছিল সহ-অভিনেতা রিচার্ড বার্টনের সঙ্গে। তাঁকে তিনি দুবার বিয়ে করেছিলেন (১৯৬৪ ও ১৯৭৫)। তাঁদের বিলাসিতা, ঝগড়া আর বহুমূল্য হীরা উপহার দেওয়ার গল্প আজও হলিউডের রূপকথা হয়ে আছে।
- অন্যান্য স্বামী: মাইকেল ওয়াইল্ডিং, মাইক টড, এডি ফিশার, জন ওয়ার্নার এবং ল্যারি ফোর্টেনস্কি।
‘ক্লিওপেট্রা’ ও ১০ লাখ ডলারের ইতিহাস
১৯৬৩ সালে ‘ক্লিওপেট্রা’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তিনি সেই সময়ে ১০ লাখ ডলার পারিশ্রমিক নিয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। এই ছবিই তাঁকে অমরত্ব দান করে। বেগুনি চোখের এই ক্লিওপেট্রার প্রেমে মজেছিল তৎকালীন বিশ্ব। তবে সমালোচকরা বলতেন, তাঁর অভিনয়ের যে গভীরতা, তা কোনো অর্থ দিয়েই মাপা সম্ভব নয়।
দুই অস্কারের মুকুট
টেইলর কেবল রূপসীই ছিলেন না, ছিলেন জাত অভিনেত্রী। পাঁচবার অস্কারে মনোনয়ন পেয়ে জিতেছেন দুইবার:
- প্রথম অস্কার: ১৯৬০ সালে ‘বাটারফিল্ড ৮’ ছবির জন্য।
- দ্বিতীয় অস্কার: ১৯৬৬ সালে ‘হুজ অ্যাফ্রেড অব ভার্জিনিয়া উলফ?’ ছবিতে এক তিক্ত-ভাঙাচোরা স্ত্রীর চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য।
হীরা, সুগন্ধি ও ব্যক্তিগত শখ
গয়না আর সুগন্ধির প্রতি এলিজাবেথের ছিল অন্যরকম আসক্তি।
- হীরা: তাঁর সংগ্রহে থাকা ‘টেইলর-বার্টন ডায়মন্ড’ বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান রত্নগুলোর একটি। ২০০২ সালে তিনি গয়না নিয়ে ‘মাই লাভ অ্যাফেয়ার উইথ জুয়েলারি’ নামে বইও লেখেন।
- সুগন্ধি: তিনি নিজে ‘ভায়োলেট আইজ’ নামে একটি পারফিউম ব্র্যান্ড চালু করেছিলেন।
- লিজ ডাকের অপছন্দ: ভক্তরা তাঁকে ভালোবেসে ‘লিজ’ ডাকলেও তিনি তা ঘৃণা করতেন; কারণ তাঁর মনে হতো এই ডাকটি সাপের ফোঁসফানির (Hissing) মতো শোনায়!
পর্দার আড়ালে মানবিক যোদ্ধা
আশির দশকে যখন এইডস মহামারির রূপ নেয়, তখন টেইলর হলিউডের গ্ল্যামার ছেড়ে দাঁড়িয়েছিলেন রোগীদের পাশে। ১৯৯১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘এলিজাবেথ টেইলর এইডস ফাউন্ডেশন’। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁকে ‘ডেম’ উপাধিতে ভূষিত করেন তাঁর মানবিক কাজের জন্য।
শেষ অধ্যায়
২০১১ সালের ২৩ মার্চ লস অ্যাঞ্জেলেসে পর্দা নামে এই কিংবদন্তির। মজার ব্যাপার হলো, তাঁর শেষকৃত্য তাঁর নিজের ইচ্ছানুযায়ী কয়েক মিনিট দেরিতে শুরু করা হয়েছিল—যাতে শেষ বিদায়ের মুহূর্তটিতেও এক ধরণের ‘স্টারডম’ ও নাটকীয়তা বজায় থাকে। এলিজাবেথ টেইলর নেই, কিন্তু তাঁর বেগুনি চোখের আভা আর জীবনকে উপভোগ করার অদম্য সাহস আজও হাজারো নারীর অনুপ্রেরণা।

