বার্তাবাংলা ডেস্ক :: দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে লাশ টেনে চলেছেন ঠাকুরগাঁওয়ের পাংকু মিয়া। ঝড় হোক বৃষ্টি হোক, রাত-দিন যাই হোক, ডাক পেলেই লাশ নিয়ে ছুটে চলতে হয় থানায়, মর্গে বা নিহতের বাড়িতে। সাধারণত অস্বাভাবিক মৃত্যু হলেই ডাক পড়ে পাংকু মিয়ার।
জীবনে বেঁচে থাকার জন্য চাই অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান। চাই শিক্ষা, চিকিৎসার অধিকার। আর এর জন্যই মানুষের আজীবনের সংগ্রাম। এই জীবনসংগ্রামে পাংকু মিয়া বেছে নিয়েছেন লাশ টানার এই বিচিত্র পেশা।
ডাক পেলেই ভ্যান নিয়ে ছুটে যান ঘটনাস্থলে। তারপর লাশ নিয়ে পৌঁছান ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে। ডোমের কাটাছেঁড়ার পর লাশ নিয়ে আবার ছোটেন নিহতের স্বজনের কাছে। এ ভাবেই হাজারও লাশ নিয়ে আসা-যাওয়া তার।
পাংকু মিয়ার পুরো নাম তোফাজ্জল হোসেন পাংকু। এযাবৎ প্রায় ৭ হাজার লাশ টেনেছেন বলে জানান পাংকু মিয়া। লাশ টানার কাজ করা নিয়ে তার হয়েছে বিচিত্র অভিজ্ঞতা আর অনুভূতি।
পাংকু মিয়া জানান, প্রথম প্রথম লাশ টানতে ভয় লাগত। একটু নির্জন স্থানে কিংবা আঁধার নামলে গা ছমছম করত। এখন আর এমনটি হয় না। লাশের প্রতি পাংকু মিয়ার খুব মমতা। শিশুদের লাশ টানতে গিয়ে তার চোখে জল এসে যায়। কোনো কোনো সময় লাশের পাশে বসেই তাকে রাত কাটাতে হয়। ক্ষুধা লাগলে সেখানেই বসে খেতে হয়। লাশ যত গলিতই হোক না কেন, তার কাছে তা আমানত।
প্রতি মাসে গড়ে চার-পাঁচটি লাশ টানতে হয় তাকে। লাশ টেনে যে আয় করেন তা দিয়েই কোনোমতে চলে তার সংসার। এক ছেলে ফরিদ (১৩) ও এক মেয়ে ইয়াসমিনের জনক পাংকু মিয়া। স্ত্রী ফরিদা তার সুখ-দুঃখের সাথী।
পাংকু মিয়া জানান, অভাবের কারণে ছেলেকে লেখাপড়া করাতে পারেননি। তাই একমাত্র পুত্রকে লাশ টানতে না দিয়ে গ্যারেজে কাজ শেখাচ্ছেন। ছেলে লাশের ভয়ে প্রায়ই নানার বাড়িতে পালিয়ে যায়।
স্ত্রী ফরিদা জানান, বিয়ের পর লাশ টানার কারণে ভয়ে বাড়ি ছেড়ে কয়েকবার পালিয়ে বাবার বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। আবারও তিনি নিয়ে এসেছেন। এরপর ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে গেছে।
পাংকু মিয়া দুঃখ করে বলেন, ‘জীবনে অনেক লাশ টেনে কোনো টাকা পাইনি। অনেকে কম দেয়। আবার বেওয়ারিশ লাশ ফ্রি টানতে হয়।’ তবু লাশের খবর পেলে পাংকু মিয়া সবকিছু ভুলে যান।
ঠাকুরগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদী হাসান জানান, লাশ টানার এ পেশায় কেউ আসতে চায় না। পচা, দুর্গন্ধ এমনকি বিকৃত নানা ধরনের লাশ মর্গে নিয়ে যাওয়া-আসা করতে হয়। সরকারিভাবে এর কোনো বেতন-ভাতা দেওয়া হয় না। লাশের খবর পেলেই পাংকু হয়ে ওঠেন দায়িত্বশীল। জীবনের তাগিদে লাশের প্রতি একরকম মমতা নিয়েই লাশ বহন করে চলেছেন পাংকু মিয়া। একটি লাশ বহন করে গড়ে ২ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত তিনি পেয়েছেন।
লাশ টানার পাশাপাশি পাংকু থানার ফুট ফরমায়েশও খাটেন। বিভিন্ন মামলার আলামত সংগ্রহ, সংরক্ষণ করেন বলে থানার বাবুরা কিছু বকশিশ তার হাতে ধরিয়ে দেন। এভাবেই চলে তার জীবনসংগ্রাম। ভয় তাকে স্পর্শ করতে পারেনি ঠিকই কিন্তু বয়সের ভারে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন বিচিত্র পেশার এ মানুষটি। বয়স্ক ভাতা অনেকের মতো তার ভাগ্যেও জোটেনি। একটি বয়স্ক ভাতার দাবি জানিয়েছেন পাংকু।
মৃতদেহ নিয়ে নানান কুসংস্কার আর অজানা ভয় তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তবে দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর দলন-পেষণ মাঝেমধ্যে তাকে স্ত্রী-সন্তান-সংসার নিয়ে ভীত করে তোলে। পাংকু লাশ টানার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য কবিরাজি চিকিৎসা করেন। কোর্ট চত্বরে মাঝেমধ্যে কবিরাজি দোকান নিয়ে বসেন।
