বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমরা অনেক সময় জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে ফেলি। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত চট্টগ্রামের চন্দনাইশের ১৮ বছর বয়সী তরুণ ফাহাদের মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, অবৈধ পথে বিদেশ যাত্রা আসলে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
কী ঘটেছিল ফাহাদের : পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা দুই মামার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ফাহাদ বিদেশে যেতে উদগ্রীব ছিলেন। ছেলের আবদার মেটাতে বাবা ৯ লাখ টাকা ঋণ করে দালালের হাতে তুলে দেন। গত ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ ঢাকা থেকে বিমানে ইথিওপিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন ফাহাদ।
দালালের প্রতিশ্রুতি ছিল বিমানে জিম্বাবুয়ে হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা নেওয়ার। কিন্তু বাস্তবে তাকে ইথিওপিয়া থেকে দীর্ঘ ১৫ দিন দুর্গম জঙ্গল ও পাহাড়ি পথে পায়ে হাঁটিয়ে জিম্বাবুয়ে সীমান্ত পার করানো হয়।

১৫ ফেব্রুয়ারি সকালে ফাহাদ দক্ষিণ আফ্রিকার মুসিনা শহরে পৌঁছান। তার মামা ফোনে পরিবারকে জানিয়েছিলেন, ফাহাদ একটি কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছেন। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ওই রাতেই অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ফোন করে ফাহাদের বাবাকে জানান, “আপনার ছেলে আর নেই।”
জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলবেন না
যদি আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ উন্নত জীবনের আশায় দালালের হাত ধরে দুর্গম পথে বিদেশ যাওয়ার কথা ভেবে থাকেন, তবে এই পোস্টটি আপনার জন্য। আমরা সবাই চাই আমাদের এবং পরিবারের অবস্থার পরিবর্তন করতে। কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি জীবনের বিনিময়ে আসে, তবে তার কোনো মূল্য নেই। চট্টগ্রামের ফাহাদের ঘটনা আমাদের সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
স্বপ্নের শেষ ঠিকানা যখন মৃত্যু
চন্দনাইশের ফাহাদ চেয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে বড় মামাদের মতো সফল হতে। ৯ লাখ টাকা খরচ করে দালালের মাধ্যমে তিনি দেশ ছেড়েছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল বিমানে করে নেওয়া হবে, কিন্তু বাস্তবে তাকে ইথিওপিয়া থেকে জিম্বাবুয়ের দীর্ঘ ও ভয়ংকর জঙ্গল দিয়ে পায়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৫ দিনের অমানুষিক পরিশ্রম, অনাহার আর অসুস্থতায় দক্ষিণ আফ্রিকায় পা রাখার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। ৯ লাখ টাকার ঋণের বোঝা এখন তার বাবার কাঁধে, আর ফাহাদ আজ কবরে।
কেন দালালের মাধ্যমে অবৈধ পথ বর্জন করবেন?
দালালরা সাধারণত সুন্দর ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু তাদের পথের বাস্তবতা অত্যন্ত ভয়াবহ। এর কিছু কারণ নিচে দেওয়া হলো:
- দুর্গম ও বিপজ্জনক পথ: দালালেরা খরচ বাঁচাতে বিমান এড়িয়ে পাহাড়, জঙ্গল বা সমুদ্রপথ ব্যবহার করে। যেখানে খাবার, পানি বা চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা থাকে না।
- লুটপাট ও নির্যাতন: অবৈধ পথে যাওয়ার সময় দালালেরা বা স্থানীয় ডাকাত দল শিক্ষার্থীদের সাথে থাকা টাকা ও খাবার কেড়ে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনও করা হয়।
- আইনি ঝুঁকি: অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়া একটি বড় অপরাধ। ধরা পড়লে বিদেশের জেলে বছরের পর বছর পচে মরতে হতে পারে।
- জীবনহানির আশঙ্কা: দীর্ঘ যাত্রা ও অনাহারে শরীর ভেঙে পড়ে, যা ফাহাদের মতো অনেক তরুণের অকাল মৃত্যুর কারণ হয়।
জীবনের ঝুঁকি না নিয়ে সঠিক পথে বিদেশে যান
বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা থাকা খারাপ নয়, কিন্তু সেটি হতে হবে বৈধ ও নিরাপদ উপায়ে।
- শিক্ষার মাধ্যমে বিদেশ যাত্রা : আপনি যদি শিক্ষার্থী হন, তবে স্কলারশিপ নিয়ে বা স্টুডেন্ট ভিসায় কানাডা, জার্মানি বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে যান। এটি সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
- দক্ষতা অর্জন: ড্রাইভিং, ইলেকট্রিশিয়ান, কম্পিউটার বা নার্সিং-এর মতো কাজে দক্ষতা অর্জন করে সরকারিভাবে (যেমন- BOESL এর মাধ্যমে) বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
- বিএমইটি নিবন্ধন: বিদেশ যাওয়ার আগে সবসময় জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) থেকে বৈধতা যাচাই করে নিন।
- দালালের কথায় বিশ্বাস করবেন না: কোনো দালাল যদি বলে জঙ্গল বা সমুদ্রপথে অল্প টাকায় বা সহজে নিয়ে যাবে, তবে নিশ্চিত জানবেন আপনি বিপদে পড়তে যাচ্ছেন।
মনে রাখবেন
আপনার জীবন আপনার বাবা-মায়ের কাছে পৃথিবীর সব সম্পদের চেয়ে দামি। উন্নত জীবন গড়ার অনেক উপায় আছে, কিন্তু জীবন একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। ফাহাদের মতো আর কোনো তরুণের প্রাণ যেন এভাবে ঝরে না যায়। দালালের খপ্পরে পড়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর বদলে তাদের চোখে চিরস্থায়ী জল আনবেন না। সবসময় সঠিক তথ্য যাচাই করুন এবং বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করুন। মনে রাখবেন, মৃত্যুপুরী পাড়ি দিয়ে পাওয়া সাফল্যের কোনো সার্থকতা নেই।

