আজকাল টুকটাক ব্যথাতে ব্যথানাশক ওষুধ সেবন অনেকের কাছে ডালভাতের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধের ব্যবহার জীবনে অনেক বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। এ কথা হয়তো অনেকে জানে না। আবার জেনেও হয়তো অনেকে অবহেলা করে।

ব্যথানাশক ওষুধের অপব্যবহার বর্তমানে এক নীরব মহামারীতে পরিণত হয়েছে। সামান্য শারীরিক অস্বস্তি বা মাথা ব্যথায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ সেবন আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মানুষের জীবনে ব্যথা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা শরীরকে কোনো সমস্যার সংকেত দেয়। কিন্তু এই সংকেতকে গুরুত্ব না দিয়ে আমরা তাৎক্ষণিক আরামের জন্য বেছে নিই পেইন কিলার বা ব্যথানাশক ওষুধ। যথাযথ নিয়ম না মেনে এই ওষুধের ব্যবহার উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করছে।
ব্যথানাশক ওষুধ আসলে কী? ব্যথানাশক ওষুধ বা অ্যানালজেসিক (Analgesics) হলো এমন এক ধরনের ওষুধ যা শরীরের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর কাজ করে ব্যথার অনুভূতি কমিয়ে দেয়। প্রধানত দুই ধরনের ব্যথানাশক দেখা যায়: NSAIDs: যেমন প্যারাসিটামল, আইবুপ্রোফেন, নেপ্রোক্সেন বা ডাইক্লোফেনাক। এগুলো সাধারণ ব্যথায় ব্যবহৃত হয়।
Opioids: এগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং মূলত জটিল সার্জারি বা ক্যান্সারের ব্যথায় ব্যবহৃত হয় (যেমন: মরফিন, প্যাথিডিন)।
কিভাবে অপব্যবহার হয়? অপব্যবহারে ক্ষতি কী
চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে সেবন করা। নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি ওষুধ খাওয়া (যেমন ১টির জায়গায় ২ টি)। দীর্ঘদিন ধরে একটানা ওষুধ চালিয়ে যাওয়া। অন্যের জন্য নির্ধারিত ওষুধ নিজে সেবন করা।
অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধ সেবন শরীরের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। এর মধ্যে একটি হলো কিডনির কার্যকারিতা হারানো। ব্যথানাশক ওষুধের সবচেয়ে বড় শিকার হয় কিডনি। দীর্ঘ সময় ধরে এসব ওষুধ সেবনের ফলে কিডনির রক্ত সঞ্চালন কমে যায় এবং টিস্যু নষ্ট হতে শুরু করে। একে ‘অ্যানালজেসিক নেফ্রোপ্যাথি’ বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগী বুঝতেই পারেন না যে তার কিডনি বিকল হয়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, আইবুপ্রোফেন বা অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ পাকস্থলীর রক্ষাকারী আস্তরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে বুক জ্বালাপোড়া, গ্যাস্ট্রিক আলসার এবং এমনকি পাকস্থলীতে ছিদ্র হয়ে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হতে পারে।
তৃতীয়ত,প্যারাসিটামলকে আমরা খুব নিরাপদ মনে করি, কিন্তু অতিরিক্ত মাত্রায় প্যারাসিটামল লিভার টক্সিসিটি তৈরি করে। লিভার সিরোসিস বা লিভার ফেইলিউরের অন্যতম কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত প্যারাসিটামল সেবন।
চতুর্থত, এটি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু নির্দিষ্ট NSAIDs দীর্ঘমেয়াদে সেবন করলে উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
পঞ্চমত, মানসিক আসক্তি বাড়ায়। ওপিঅয়েড জাতীয় ব্যথানাশকগুলো মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’কে প্রভাবিত করে। ফলে রোগী ওষুধের ওপর মানসিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ওষুধ না পেলে অস্থিরতা, অনিদ্রা এবং বিষণ্নতা দেখা দেয়।
কেন এই প্রবণতা বাড়ছে?
আমাদের দেশে ব্যথানাশক ওষুধের অপব্যবহার বাড়ার পেছনে বেশ কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। হাত বাড়ালেই প্রেসক্রিপশন ছাড়া যেকোনো ফার্মেসিতে পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষ মনে করে ব্যথা কমানোর ওষুধ মানেই নিরাপদ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার চেয়ে ১০ টাকার ওষুধ খেয়ে কাজ চালানোকে অনেকে সাশ্রয়ী মনে করে।
প্রতিকারের উপায় কী
ব্যথানাশক ওষুধের অভিশাপ থেকে বাঁচতে হলে আমাদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা জরুরি। যেকোনো ওষুধ সেবনের আগে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। হালকা ব্যথায় ফিজিওথেরাপি, গরম সেঁক, যোগব্যায়াম বা ম্যাসাজ করুন। ওষুধের পাতায় লেখা বা চিকিৎসকের বলে দেওয়া ডোজের বাইরে এক ফোঁটাও বেশি খাবেন না। আপনার যদি আগে থেকে কিডনি বা হার্টের সমস্যা থাকে, তবে ডাক্তারকে তা অবশ্যই জানান।
ব্যথানাশক ওষুধ জীবন রক্ষাকারী হতে পারে, যদি তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু অলসতা বা অসচেতনতার কারণে একে মুড়ি-মুড়কির মতো খেলে তা নিশ্চিত মৃত্যুর কারণ হতে পারে। মনে রাখতে হবে, সাময়িক আরাম যেন চিরস্থায়ী যন্ত্রণার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। সুস্থ থাকতে হলে ওষুধের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়া প্রয়োজন।

