মো. আবুল হাসান ও খন রঞ্জন রায় :: শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষার উদ্দেশ্য মনুষ্যত্বের বিকাশ। ল্য মানব মুক্তি ও উন্নয়ন। সভ্যতা ও উন্নয়নের চাবিকাঠি শিক্ষা। বৈষয়িক উন্নতি ও মানসিক প্রশান্তির জন্যও শিক্ষার প্রয়োজন। শিক্ষাই মানষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এর শক্তি অপরিমেয় ও অসীম। শিক্ষার কাছে সব শক্তিই অসহায়। তাই বলা হয়ে থাকে ‘অসির চেয়ে মশির শক্তি বেশি’ দণি আফ্রিকার স্থপতি নেলসন মেন্ডেলা তার আত্মজীবনী ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ গ্রন্থে বলেছেন, শিক্ষা ব্যক্তিগত উন্নয়নের বৃহৎ চালিকাশক্তি। শিা উৎপাদনশীলতা ও সৃজনশীলতার হৃদপিণ্ড। শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ রূপ ফুঁটে উঠেছে প্যারাডাইস লস্টের বিখ্যাত কবি মিল্টনের বক্তব্যে। তিনি বলেন- Education is the harmonious development of body, mind and soul. শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তাহলে শিক সেই মেরুদণ্ড গড়ার কারিগর। মানষের মধ্য থেকে সুকুমারবৃত্তিগুলোকে তপ্ত করে এনে মানুষকে সভ্য এবং সুন্দর করে গড়ে তোলার গুরুদায়িত্ব শিকের। উন্নত বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মূল্যয়ন করা হয় প্রাথমিক শিাকে। মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রাথমিক শিক্ষাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
প্রাথমিক শিক্ষার ল্ক্ষ্য হল শিশুর দৈহিক, মানসিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক, মানবিক ও নান্দনিক বিকাশ সাধন এবং তাকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করা। এ বিশাল ল্য বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিক শিা ব্যবস্থাকে অতি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সে সঙ্গে প্রাথমিক শিকদের মূল্যায়ন করা হয় সেভাবে। আর বাংলাদেশে তার সম্পূর্ণ উল্টো। বাংলাদেশে প্রাথমিক শিা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থায় বেশ কিছু অন্তরা বিদ্যমান। যাতে উন্নত বিশ্বের শিা ব্যবস্থার সঙ্গে এ দেশের প্রাথমিক শিা ব্যবস্থার কোন সর্ম্পক নেই। প্রথমে উল্লেখ করা যায়, শিকদের যোগ্যতার মানদণ্ড ও বেতন ভাতা প্রশ্নসাপেক্ষ।
যোগ্য নাগরিক-কর্মী তৈরির সূতিকাগার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষকরা এ কারখানার কারিগর। তাই যোগ্য মন্ত্রী, আমলা, নেতা, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, বিচারক, আইনবিদ, সাংবাদিক, লেখক, শ্রমিক-কর্মচারী সবই তৈরিরম পূর্বশত সুযোগ্য শিক। শুধু বেসরকারি নয় সব শিক, প্রশিক ও হুজুরদেরই যথাযথ শিাগত যোগ্যতার মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। শিক্ষার উদ্দেশ্য, শিশু-কিশোর মনোবিজ্ঞান ও শিা প্রদানের আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি জানা থাকা দরকার। বিশ্বমানের প্রশিণ এবং প্রতিনিয়ত প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের ঐকান্তিক ইচ্ছার অধিকারী হওয়া দরকার একজন শিককে।
প্রস্তাবিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক নিয়োগ বিধিমালা-২০১২ ইতোমধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অনুমোদন করেছে। সেটি এখন পরবর্তী পদেেপর জন্য প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে উপস্থাপন করার প্রস্তুতি শেষ করেছে প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয়। আগামী জুলাই মাসে এই বিধিমালা সংশোধনের কাজ শেষ করা হতে পারে। প্রস্তাবিত বিধিমালায় সহকারি শিক নিয়োগের শিাগত যোগ্যতার শর্তে বলা হয়েছে, নারী ও পুরুষ শিকদের জন্য আলাদা যোগ্যতার বিষয়টি বিলুপ্ত হবে। সেখানে ডিগ্রি বা সমমানের হবে।
প্রস্তাবিত বিধিমালা শিক নিয়োগে ৫০ শতাংশ নারী কোটা, ২০ শতাংশ পোষ্য কোটা ও ৩০ শতাংশ পুরুষ কোটা রাখা হয়েছে। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিকদের মধ্যে ৫০ দশমিক ২ শতাংশ নারী। ও ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ পুরুষ। অর্থাৎ লিঙ্গ সমতা অর্জন হয়েছে। এজন্য নারী কোটা শতাংশ কমানো হয়েছে। তবে পোষ্যসহ অন্যান্য কোটা থেকেও নারীরা শিক হয়ে আসেন। নিজ উপজেলার মধ্য থেকেই সব শিক নিয়োগের ওপর জোর দেয়া হয়েছে প্রস্তাবিত বিধিমালায়। তবে বিকল্প উপায়েও শূন্যপদ পূরণের প্রস্তাব থাকছে।
আমাদের রয়েছে প্রায় দুশ’ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার করুণ ইতিহাস। সঙ্গে সঙ্গে এ দেশের শিা ব্যবস্থায়ও রয়েছে এই দীর্ঘ সময়ের ঔপনিবেশিকতার কালকানুনের কালিমা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই উচিত ছিল পুরনো শিা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে স্বাধীন দেশের উপযোগী একটা শিা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। কিন্তু দঃজনক হলেও সত্য, তা আজ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্যভাবে প্রবর্তিত হয়নি। বিশেষ করে প্রাথমিক শিা ব্যবস্থায় রয়ে গেছে স্বাধীন দেশের উপযোগী পাঠ্যক্রম ও দ শিকের অভাবসহ সীমাহীন অব্যবস্থা ও দুর্বলতা পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও জাপানে রয়েছে যুগোপযোগী শিার পাঠ্যক্রম এবং মানবিক ও দেশপ্রেমসম্পূন্ন গুণাবলী অর্জনের ট্রেনিং। ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন অ্যাডুকেশন কোর্সের শিা ও প্রশিণ শিক নিয়োগ লাভের পূর্বশর্ত।
শিক শব্দটির সাথে ‘প্রশিণ’ কথাটি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। ‘প্রশিণ’ব্যতীত শিকতা পেশার পরিপূর্ণতা আসেনা। আমরা সকলেই জানি জ্ঞান অর্জন নতুন জ্ঞান আবিষ্কার এবং নতুন কলাকৌশল আয়ত্তকরণ ও তা প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ অতি দ্রুত পৃথিবীর পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। এ পরিবর্তনের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে শিক। আমাদের প্রতিবেশী অনেক দেশ যারা মাত্র ২০/২৫ বছর পূর্বে আমাদের চেয়ে এগিয়ে ছিল না, বর্তমানে তাদের এবং আমাদের দূরত্ব হাজার কদমেরও বেশী। তার সর্বপ্রধান কারণ সুষম জাতীয় বিকাশে শিায় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব আরোপ এবং গুণগত বিকাশ সাধনে পারঙ্গমতা অর্জন।
৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন অ্যাডুকেশন ডিগ্রিধারী শিকরা একবিংশ শতাব্দীর চেলেঞ্জ উপযোগী বিষয়ভিত্তিক শিায় জাতিকে এগিয়ে নিয়ে পারে। সদ্য পাশ এস.এস.সি, এ প্লাস (অ+) তরণদেরকে রিক্রুট করে ৪ বছর মেয়াদি শিক শিাকোর্স অধ্যয়নের সুযোগ দিতে হবে। মানসম্পন্ন শিক অপরিহার্য বিধায় অবশ্যই প্রশিণ করার কার্যকর পদপে গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ ল্েয শিক নিয়োগের সুচিন্তিত ও বলিষ্ঠ নীতিমালা গ্রহণ করা জরুরি। এ নীতিমালায় প্রথমত, পেশা হিসেবে শিকতাকে আর্কষণীয় করতে হবে। শিকতাকে লোভনীয় করতে হলে তাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে সর্বাগ্রে। ৪ বছর মেয়াদি শিা প্রশিণের কারণে শিকদের আর্থিক সুযোগ সুবিধা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার, ডিপ্লোমা নার্সদের ন্যায় দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদা প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। এভাবে মেধাবী শিার্থীর শিকতা পেশায় আকৃষ্ট করার ব্যবস্থাক গ্রহণ করতে পারলে যোগ্য শিকের জোগান নিশ্চিত করার পথ সুগম হবে। শিা গড়ে উঠবে বাস্তবিক অর্থে সজৃনশীলতা প্রকাশ ও বিকাশের অনুপম ত্রে।
মো. আবুল হাসান, সভাপতি
খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব
ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।
৪৭, মতি টাওয়ার, চকবাজার, চট্টগ্রাম।
