দিনশেষে পিঠের নিচের দিকে একটা হালকা ব্যথা, ঘাড়ে অস্বস্তি, কিংবা ছুটির দিনেও এক ধরনের ক্লান্তি, খুব চেনা লাগছে কি? আধুনিক করপোরেট জীবনে আমাদের দিনের প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টাই কাটে একটা চেয়ারে বন্দি হয়ে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ আর কিবোর্ডে আঙুল চালাতে চালাতে আমরা ভুলেই যাই, আমাদের শরীরটা এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থবির থাকার জন্য তৈরি হয়নি। চিকিৎসাবিজ্ঞান একে বলছে ‘সিটিং ডিজিজ’ বা উপবিষ্ট রোগ। ধূমপান যেমন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘক্ষণ চেয়ারে বসে থাকাও ঠিক ততটাই বিপজ্জনক। কিন্তু জীবিকার তাগিদে ডেস্কে তো বসতেই হবে, তাহলে উপায়?

টানা বসে থাকা কেন আমাদের শরীরের জন্য ‘টাইম বোম’?
আমরা যখন দীর্ঘ সময় কোনো শারীরিক নড়াচড়া ছাড়া বসে থাকি, তখন আমাদের শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। ফলে খাবার থেকে পাওয়া ক্যালরি চর্বি হিসেবে জমা হতে শুরু করে। কিন্তু ক্ষতিটা কেবল ওজনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর প্রভাব পড়ে শরীরের গভীরতম অঙ্গপ্রত্যঙ্গেও।
১. হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি
গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি সময় বসে কাজ করেন, তাঁদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। টানা বসে থাকলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যায়, যার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ে এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের পথ সুগম হয়।
২. মেরুদণ্ড ও পেশির স্থায়ী ক্ষতি
সোজা হয়ে বসে থাকার চেয়ে আমরা অনেকেই ডেস্কে একটু ঝুঁকে বসতে পছন্দ করি। এই ভুল ‘পোশ্চার’ বা বসার ভঙ্গির কারণে আমাদের মেরুদণ্ডের ডিস্কগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ফলে ক্রনিক কোমর ব্যথা, ঘাড় ব্যথা এবং সায়াটিকার মতো জটিল সমস্যা দেখা দেয়।
‘সিটিং ডিজিজ’ থেকে মুক্তির সহজ লাইফস্টাইল টিপস
কাজের চাপে আমাদেরও হয়তো ডেস্ক ছেড়ে ওঠার সময় থাকে না। তবে ছোট ছোট কিছু সচেতন অভ্যাস বদলে দিতে পারে পুরো দৃশ্যপট। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিচের টিপসগুলো আজ থেকেই অ্যাপ্লাই করতে পারেন:
- ২০-২০-২০ নিয়ম মানুন: প্রতি ২০ মিনিট পর পর স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকুন। এতে চোখের ওপর চাপ কমবে।
- পোমোডোরো টেকনিক ব্যবহার করুন: কাজের মাঝে ২৫ মিনিট পর পর ৫ মিনিটের একটি ছোট ব্রেক নিন। এই ৫ মিনিটে একটু উঠে দাঁড়ান, হাত-পা প্রসারিত (Stretch) করুন বা এক গ্লাস পানি খেয়ে আসুন।
- ডেস্ক স্ট্রেইচিং: চেয়ারে বসেই ঘাড় ডানে-বামে ঘোরানো, কাঁধ পেছনের দিকে নেওয়া এবং পায়ের পাতা ওঠানামা করানোর মতো হালকা ব্যায়ামগুলো করে নিতে পারেন।
খাদ্যাভ্যাসে আনুন একটুখানি সচেতনতা
যেহেতু ডেস্কে বসে কাজ করলে ক্যালরি কম খরচ হয়, তাই আমাদের প্রতিদিনের ডায়েটের দিকে একটু বাড়তি নজর দেওয়া জরুরি। লাইফস্টাইল মডিফিকেশনের বড় একটা অংশ জুড়ে থাকে আমাদের খাবার টেবিল।
ক্যাফেইন ও প্রক্রিয়াজাত খাবারকে ‘না’ বলুন
কাজের ক্লান্তি দূর করতে আমরা ঘন ঘন চা-কফি বা স্ন্যাক্স হিসেবে চিপস-বিস্কুট খাই। এগুলো সাময়িক শক্তি দিলেও রক্তে হুট করে সুগার বাড়িয়ে দেয়। এর বদলে ডেস্কে রাখতে পারেন কাঠবাদাম, পেস্তা বাদাম বা মিক্সড নাটস এবং মৌসুমি ফল।
হাইড্রেশন হোক আপনার প্রধান হাতিয়ার
অনেক সময় অলসতার কারণে আমরা ডেস্কে পানি খেতে ভুলে যাই। টেবিলে সবসময় এক লিটারের একটি ওয়াটার বোতল রাখুন। পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীর থেকে টক্সিন বের হয়ে যায় এবং বারবার উঠে পানি খাওয়ার বাহানায় আপনার কিছুটা হাঁটাচলাও হয়ে যাবে।
কর্মক্ষেত্র হোক সুস্থতার নতুন ঠিকানা
অফিসের পরিবেশকেও আপনি আপনার সুস্থতার পক্ষে ব্যবহার করতে পারেন। আজকাল অনেক আধুনিক অফিসে ‘স্ট্যান্ডিং ডেস্ক’ বা দাঁড়িয়ে কাজ করার টেবিল ব্যবহার করা হয়। আপনার অফিসে এমন সুবিধা থাকলে দিনে অন্তত ১-২ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাজ করার অভ্যাস করুন। সহকর্মীদের সাথে কোনো জরুরি আলোচনা থাকলে কনফারেন্স রুমে না বসে ‘ওয়াকিং মিটিং’ বা হাঁটতে হাঁটতে কথা বলার সংস্কৃতি চালু করতে পারেন। মনে রাখবেন, লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করার মতো ছোট সিদ্ধান্তগুলোই দিনশেষে বড় পরিবর্তন আনে।
শেষ কথা: সুস্থতা আপনার নিজের হাতে
জীবিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, জীবনকে সুস্থ রাখাটা তার চেয়েও বেশি জরুরি। ডেস্কে বসে কাজ করা মানেই রোগব্যাধিকে আমন্ত্রণ জানানো নয়, যদি আপনি সচেতন হন। আজ থেকেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে একটু নড়াচড়া শুরু করুন। মনে রাখবেন, শরীর সচল তো জীবন সফল। আগামী কর্মদিবস থেকে আপনার ডেস্কে এই ছোট পরিবর্তনগুলো আনছেন তো?

