ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বর যাচ্ছেন কনের কাছে। তাঁর পেছনে গাড়ির বহর। এত গাড়ি যে মহাখালী ডিওএইচএস থেকে পাঁচ তারকা শেরাটন হোটেল পর্যন্ত রাস্তায় যানজট লেগে যায়! নব্বইয়ের দশকে ঢাকার মানুষের কাছে এমন দৃশ্য ছিল রীতিমতো বিস্ময়ের। আর সেই বিয়ের বর–কনে ছিলেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় জুটি মৌসুমী ও ওমর সানী। এই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন ছিল বিয়ের দেড় বছর পর, বিবাহোত্তর সংবর্ধনায়। তারও আগে, ১৯৯৫ সালের ৪ মার্চ, দুই পরিবারের কাছের মানুষ ও দুজনের ঘনিষ্ঠ দুজন চলচ্চিত্র পরিচালকের উপস্থিতিতে চুপিসারে বিয়ে করেছিলেন মৌসুমী ও ওমর সানি।

ঘোড়ার গাড়িতে ওমর সানীর সঙ্গে সেদিন ছিলেন বাপ্পারাজ, অমিত হাসানসহ আরও অনেকে। আর তাঁদের পেছনে ছিল ১১৭টি গাড়ির বহর। মহাখালী ডিওএইচএস থেকে শাহবাগের শেরাটন হোটেল পর্যন্ত সেই দীর্ঘ গাড়ির লাইনে থমকে যায় রাস্তার অন্যদের গাড়ি চলাচল। ওমর সানীর মতে, তিনি যখন বিজয় সরণিতে ঘোড়ার গাড়িতে ছিলেন, তখন শেষ গাড়িটি তাঁদের মহাখালীর বাসার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল।
আগস্টের ২ তারিখ, বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের তিন দশক পূর্ণ হয়েছে। তার আগে কথা প্রসঙ্গে সেদিনের সেই কথা মনে করলেন ওমর সানী। মনে করলেন তাঁদের প্রথম দেখা থেকে প্রেম-ভালোবাসা, ভালো লাগা এবং বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের সেই দিনের কথাও।
‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির মহরতেই প্রথম দেখা মৌসুমী ও ওমর সানীর। তখন ওমর সানীর একটি ছবি মুক্তি পেলেও মৌসুমীর অভিনয়জীবন মাত্র শুরু। পরে পরিচালক শেখ নজরুল ইসলাম নতুন একটি ছবির প্রস্তাব নিয়ে ওমর সানীকে সঙ্গে করে মৌসুমীদের ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসায় যান। সেখানেই তাঁদের প্রথম কথা। তবে সেই ছবিতে অভিনয় করতে পারেননি মৌসুমী। অন্য ছবির ব্যস্ততার কথা জানিয়ে বিনয়ের সঙ্গে না করে দেন মৌসুমী। মন খারাপ নিয়েই সেদিন ফিরেছিলেন ওমর সানী।
১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তির পর কয়েকজন প্রযোজকের উদ্যোগে ‘দোলা’ ছবিতে প্রথমবার জুটি বাঁধেন মৌসুমী ও ওমর সানী। সিলেটে শুটিং করতে গিয়ে তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্যও হয়। কিন্তু সেই দূরত্বই একসময় পরিণত হয় ভালো লাগায়। ওমর সানী জানালেন, মৌসুমীর ব্যক্তিত্ব, তাঁর পরিবারের আন্তরিকতা এবং আচরণ তাঁকে মুগ্ধ করেছিল।
এরপর ‘আত্ম অহংকার’ ছবির শুটিংয়ে জৈন্তাপুরে গিয়ে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। ৩ নভেম্বর মৌসুমীর জন্মদিন উপলক্ষে শুটিং স্পটেই ওমর সানী তাঁর নিজের গলায় থাকা সাড়ে তিন-চার ভরি ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন উপহার দেন মৌসুমীকে। চেইনটি সানিকে দিয়েছিলেন তাঁরই মা। সেই উপহার মৌসুমীকেও বিস্মিত করেছিল।
ঢাকায় ফিরে একদিন ঘোমটা পরে ওমর সানীর বাসায় হাজির হন মৌসুমী। কারণ, তিনি নাকি সানীকে নিয়ে একটি দুঃস্বপ্ন দেখেছেন। এফডিসিতে যাওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে তাই এই আসা। সেই মুহূর্তে ওমর সানীর মনে হয়েছিল, তাঁদের সম্পর্ক আর শুধু সহশিল্পীর মধ্যে আটকে নেই।
একসময় মৌসুমীকে ভালোবাসার কথা নিজের মায়ের কাছেও জানান ওমর সানী। পরে একটি ম্যাগাজিনে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে অকপটে বলে ফেলেন, ‘আমি ওকে ভালোবাসি। ও আমাকে ভালোবাসে কি না জানি না।’ সাক্ষাৎকারটি পড়ে মৌসুমী অবাক হলেও ওমর সানী নিজের অবস্থান থেকে আর সরে আসেননি।
এদিকে ওমর সানীর মা এবং মৌসুমীর নানির মধ্যে গড়ে ওঠে আন্তরিক সম্পর্ক। দুজনই চেয়েছিলেন এই সম্পর্ক বিয়েতে গড়াক। যদিও শুরুতে মৌসুমীর মা চাননি মেয়ের বিয়ে চলচ্চিত্র অঙ্গনের কারও সঙ্গে হোক। পরে তিনিও মত বদলান।

