অন্দরকিল্লা (অভ্যন্তরীণ দুর্গ) বলে কথিত একটি উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত চট্টগ্রাম শহরে মুগলদের প্রথম স্থাপত্যকর্ম হলো অন্দরকিলা মসজিদ। যাকে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদও বলা হয়। মসজিদের ফারসি ভাষার শিলালিপি থেকে জানা যায়, সুবাহদার শায়েস্তা খান এটি ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন। ধারণা করা হয়, এ মসজিদের প্রকৃত নির্মাতা ছিলেন সুবাহদারের জ্যৈষ্ঠপুত্র ও চট্টগ্রাম বিজেতা বুযুর্গ উমেদ খান, তবে তাঁর নামের কোনো উল্লেখ শিলালিপিতে নেই।

মসজিদটি দীর্ঘদিন যাবৎ অব্যবহৃত ছিল। ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তারা এটিকে ১৭৬১ সালে অস্ত্র ও গোলাবারুদের গুদামে রূপান্তর করেছিলেন। ১৮৫৩ সালে হামিদুল্লা খানের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় মুসলিম বাসিন্দারা এটিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের নিকট ছেড়ে দেওয়ার জন্য সরকারকে অনুরোধ করেন। ১৮৫৫ সালে মসজিদটি মুক্ত হয় এবং একটি শিলালিপি থেকে জানা যায়, মসজিদটি সম্পূর্ণরূপে সংস্কার করা হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে এর পরিসর বৃদ্ধি করা হয় এবং এর আদি অবয়বের অনেকটাই পরিবর্তন করা হয়। এ ইমারতের পরিবর্ধন ও সংস্কার প্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত আছে এবং এটি এখন বহুতলবিশিষ্ট একটি ইমারত। বহুবার সংস্কার কাজের পরও মসজিদের মূল কাঠামো সংরক্ষিত আছে।
আদি মসজিদটি আয়তাকার। এর ভেতরের পরিমাপ উত্তর-দক্ষিণে ১৭.০৭ মি এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৭.৩০ মি। চারটি অষ্টভুজাকৃতির কোণার বুরুজগুলির মধ্যে পেছনদিকের দুটি এখনও বিদ্যমান। পূর্বদিকে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ উভয়দিকে একটি করে মোট পাঁচটি খিলান প্রবেশদ্বার আছে। এগুলিকে প্রশস্ত করা হয়েছে।
প্রতিটি ক্রুশাকৃতি খিলান ছাদের মাঝখানে একটি ছোট কৃত্রিম গম্বুজ বসানো হয়েছে, যা শুধু বাইরের দিক থেকে দেখা যায়। এ গম্বুজগুলি বাইরের দিক থেকে মসজিদটিকে একটি ‘তিন গম্বুজ’ বিশিষ্ট মসজিদের রূপ দিয়েছে। সবগুলি গম্বুজের শীর্ষভাগ স্বাভাবিক পদ্ম ও কলস চূড়া দ্বারা পরিশোভিত।
পার্শ্ববর্তী আয়তাকার ‘বে’গুলির উপর স্থাপিত ক্রুশাকৃতি খিলান ছাদ সম্পর্কে বিশেষ কিছু মন্তব্য করা যায়। মসজিদের এ বিশেষ বৈশিষ্ট্য এ যাবৎ বাংলার স্থাপত্যে দেখা যায় নি। তাই মনে হয়, এটি সরাসরি উত্তর-ভারতের মুগল স্থাপত্য থেকে এখানে এসেছে। এ ধরনের বৈশিষ্ট্য ফতেহপুর সিক্রিতে তুর্ক সুলতানার হাম্মামে দেখা যায়। ক্রুশাকৃতির খিলান ছাদ ইরানি স্থাপত্যে বারো শতকের শুরু থেকে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। মুসলিম স্থাপত্যে এ বৈশিষ্ট্যের প্রাথমিক দুটি উদাহরণ ‘কুসির অমর’ (আনুমানিক ৭১৪) এবং রাক্কা নগরে অবস্থিত ‘বাগদাদ তোরণে’ দেখা যায়।
সূত্র : বাংলাপিডিয়া

