২০২৪ সালের জুলাই মাসে আমি বাংলাদেশে অবস্থান করছিলাম। সেই সময়ের শুরুতে কেউ কি কল্পনাও করতে পেরেছিলেন, যে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভূমিকম্পটি ঘটে যাবে? সম্ভবত না।
কিন্তু দিন যতই এগোয়, ততই দৃশ্যপট পাল্টাতে থাকে। জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে, কারফিউ আর নানা জটিলতা পেরিয়ে, সৌদি আরব হয়ে আমি নিউইয়র্কে ফিরে আসি। মক্কা শরীফে অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও শেখ হাসিনার বিদায়ের সংবাদ পাই।
এটি ছিল অবিশ্বাস্য, কিন্তু অনিবার্য এক ঘটনা।
বর্তমানে বাংলাদেশ ইতিহাসের এক গভীর সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে এসেছেন, তাঁর ভাষায় ‘ছাত্রদের অনুরোধে’। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আর্থসামাজিক কাঠামোতে ব্যাপক সংস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে একটি নতুন ও স্বচ্ছ বাংলাদেশের। কিন্তু এই পরিবর্তনের বাস্তব প্রতিফলন আদৌ কতটা সম্ভব— তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দোদুল্যমানতা ও গভীর সংশয় রয়ে গেছে। গত আট-নয় মাসের ঘটনাপ্রবাহে দেশের জনগণ নতুন নেতৃত্বের ওপর খুব একটা আস্থা রাখতে পারছে বলে মনে হয় না। ঘোষণায় যতই উচ্চবাচ্য থাকুক, বাস্তবে তা প্রায় অনুপস্থিত।
আর যেসব ছাত্ররা এই ‘বিপ্লব’-এর মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই মনে করছেন সদ্য বিদায়ী আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করাই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। ইতোমধ্যে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ হয়েছে।
যদিও আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ নয়, তবু দলটির উপস্থিতি কার্যত দৃশ্যপট থেকে মুছে গেছে। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা নিষ্ক্রিয়, কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় একটি অংশ কারাবন্দী বা পলাতক। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতের আশ্রয়ে রয়েছেন।
প্রশ্ন হলো, এই অবস্থায় আওয়ামী লীগের করণীয় কী? স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী একটি ঐতিহাসিক দল হিসেবে এর ভবিষ্যৎ কোন পথে? বর্তমান বাস্তবতায় পুরনো কাঠামো ধরে রাখার চেষ্টা নয়, বরং সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ নেতৃত্বে দলকে পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন : শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে কি আওয়ামী লীগের পুনর্জাগরণ সম্ভব? কিংবা তা কি কাম্য?— আমার দৃষ্টিতে, তা নয়। আগামী দিনের আওয়ামী লীগকে শেখ হাসিনাকে ছাড়াই এগিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজন তৃণমূলভিত্তিক সংগঠন পুনর্গঠন, আধুনিক ও দূরদর্শী নেতৃত্ব সৃষ্টি এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার।
বিএনপির অবস্থাও তথৈবচ। আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর, প্রাথমিকভাবে দলটির মধ্যে ছিল আত্মবিশ্বাস। মনে হচ্ছিল, তারা যেন ক্ষমতার খুব কাছাকাছি। কিন্তু সময়ের সাথে সেই আত্মবিশ্বাস ম্লান হয়ে এসেছে।
এটি খুবই স্বাভাবিক— প্রায় দেড় দশক ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির মধ্যে ক্ষোভ ও অস্থিরতা কাজ করাটাই স্বাভাবিক। বাস্তবতা হলো, এখন একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হলে, বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে।
তবে আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিও একটি মারাত্মক ভুল করতে পারে— যদি তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আবারও বেগম খালেদা জিয়াকে ঘিরে আবর্তিত হয়।
দুজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া, দুজনেরই বয়স আশির কাছাকাছি। বাস্তবতার নিরিখে তাঁরা আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসবেন না। এটি শুধু রাজনৈতিক বাস্তবতাই নয়, এটি বিজ্ঞানের বাস্তবতাও। সেই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
সবচেয়ে বড় সত্য হলো— এখনও বাংলাদেশের মূল দুই রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এই দুই দলের বাইরে অন্য সব রাজনৈতিক দল এখনোও তুলনামূলকভাবে দুর্বল ও প্রাসঙ্গিকতার সংকটে।
ফলে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি যদি সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে হয়, তবে এই দুই দলকেই নেতৃত্ব নিতে হবে— তবে পুরোনো মুখ নয়, নতুন নেতৃত্ব, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আর আধুনিক রাজনৈতিক দর্শন নিয়েই।
লেখক : ডেইলি স্টারের সাবেক ব্যুরো প্রধান, নিউইয়র্কপ্রবাসী সাংবাদিক

