ক্যাঙ্গারুর দেশ অস্ট্রেলিয়া বরাবরই বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষা প্রত্যাশীদের স্বপ্নের গন্তব্য। প্রতি বছর হাজার হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী উন্নত জীবন আর মানসম্মত শিক্ষার আশায় পাড়ি জমান এই দেশটিতে। কিন্তু সেই স্বপ্নের আকাশে এবার কিছুটা হলেও উদ্বেগের মেঘ জমতে শুরু করেছে। সম্প্রতি ওশেনিয়ার এই দেশটিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের একটি অংশের বিরুদ্ধে আশ্রয় ও অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন দেশটির কট্টরপন্থী দল ‘ওয়ান নেশন পার্টি’-এর নেতা পলিন হ্যানসন। তাঁর এক নতুন প্রস্তাবনা রীতিমতো কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত এবং ভবিষ্যতে যেতে ইচ্ছুক লাখো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর বুকে। পড়াশোনার আড়ালে অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি দাবি করেছেন, অনতিবিলম্বে বন্ধ করা হোক বিদেশি শিক্ষার্থীদের ‘ব্রিজিং ভিসা’।

পলিন হ্যানসনের অভিযোগ: পড়াশোনা নাকি অর্থনৈতিক সুবিধা?
গত মঙ্গলবার (৯ জুন) এক নীতিগত ঘোষণায় পলিন হ্যানসন অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান অভিবাসন ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, সিডনি বা মেলবোর্নের মতো বড় শহরগুলোতে চলমান আবাসন এবং জীবনযাত্রার সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই অভিবাসন ব্যবস্থার গলদ।
১. স্টুডেন্ট ভিসার আড়ালে কাজের সুযোগ নেওয়া
হ্যানসনের দাবি, অনেক শিক্ষার্থী প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়ায় আসে না। তারা প্রথমে একটি নামী প্রতিষ্ঠানে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে প্রবেশ করে, কিন্তু পরবর্তীতে সেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে সস্তা ও নিম্নমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কোর্সে ভর্তি হয়। এর মূল উদ্দেশ্য থাকে পড়াশোনার চেয়েও অস্ট্রেলীয় ডলারের উচ্চ মজুরি ও অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করা।
২. ব্রিজিং ভিসার দীর্ঘমেয়াদি অপব্যবহার
অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, এক ভিসা থেকে অন্য ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীরা ‘ব্রিজিং ভিসা’ (Bridging Visa) পান। হ্যানসন পরিসংখ্যান টেনে দেখান যে, নতুন স্টাডি ভিসার আবেদন নিষ্পত্তি হতে গড়ে প্রায় ২০০ দিন সময় লাগে। আবেদন বাতিল হলে তারা আবার আপিল করে, যা চূড়ান্ত হতে আরও ৬৪ সপ্তাহ লেগে যায়। আর এই পুরো সময়টা জুড়ে শিক্ষার্থীরা ব্রিজিং ভিসার আওতায় থেকে অবাধে কাজ ও বাসস্থানের সুযোগ পায়, যা হ্যানসনের মতে অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব নাগরিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন করছে।
‘আশ্রয় প্রার্থনা’ ও দীর্ঘমেয়াদি আইনি ফাঁকফোকর
পলিন হ্যানসন তাঁর বক্তব্যে অস্ট্রেলিয়ার শরণার্থী বা আশ্রয় (Asylum) ব্যবস্থার ফাঁকফোকরের দিকেও আঙুল তুলেছেন। তিনি দাবি করেন, কোনো রকম যৌক্তিক ভিত্তি ছাড়াই অনেক শিক্ষার্থী কেবল দেশটিতে অবস্থান দীর্ঘ করার জন্য রাজনৈতিক বা মানবিক আশ্রয়ের আবেদন করে বসে।
“একটি আশ্রয়ের আবেদন নিষ্পত্তি হতে গড়ে প্রায় তিন বছর সময় লাগে। সেই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলেও আদালতের দরজায় আপিলের সুযোগ থাকে। ফলে বছরের পর বছর তারা আইনি প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যাচ্ছে।” — পলিন হ্যানসন, নেতা, ওয়ান নেশন পার্টি।
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণেই গত কয়েক বছরে ব্রিজিং ভিসায় থাকা বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ১৩ হাজার থেকে লাফিয়ে ১ লাখ ৭ হাজারে পৌঁছেছে বলে দাবি করেন এই কট্টরপন্থী রাজনীতিবিদ।
তোপের মুখে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো
এই সংকটের জন্য কেবল শিক্ষার্থীদেরই নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার নামী-দামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন হ্যানসন। তাঁর ভাষায়, “বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি শিক্ষার্থীদের সহজ অর্থের (Easy Money) প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে।” আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া চড়া টিউশন ফির ওপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই অতি-নির্ভরশীলতা পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে বাণিজ্যিকীকরণ করে ফেলেছে এবং তারা এই অভিবাসন সংকটের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রাখছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের এই বাণিজ্যিক মানসিকতা পরিবর্তন করে সবার আগে অস্ট্রেলিয়ানদের শিক্ষার প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য করা উচিত।
প্রস্তাবিত নতুন নীতিমালায় কী আছে?
পলিন হ্যানসনের প্রস্তাবিত এই কট্টর নীতি যদি সত্যি কার্যকর হয়, তবে অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁর নীতিমালার মূল দিকগুলো হলো:
- নিজ দেশে ফিরে আবেদন: কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী যদি অস্ট্রেলিয়ায় এক কোর্স শেষ করে অতিরিক্ত বা উচ্চতর কোনো পড়াশোনার জন্য পুনরায় আবেদন করতে চায়, তবে সে অস্ট্রেলিয়ায় থেকে আবেদন করতে পারবে না। তাকে প্রথমে নিজের দেশে ফিরে যেতে হবে এবং সেখান থেকে নতুন ভিসার আবেদন করতে হবে।
- আপিলের সুযোগ বাতিল: কোনো শিক্ষার্থী পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে দিলে বা ড্রপআউট হলে তার ব্রিজিং ভিসা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করা হবে। শুধু তাই নয়, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে কোনো ধরনের আপিল করার সুযোগও রাখা হবে না।
শেষ কথা: বিশ্বমঞ্চে অস্ট্রেলিয়ার ভাবমূর্তি ও ভবিষ্যৎ
পলিন হ্যানসনের এই প্রস্তাব পাস হওয়া বা না হওয়া অনেকটাই নির্ভর করছে অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর। তবে এ ধরনের কট্টর প্রস্তাবনা বৈশ্বিক শিক্ষা বাজারে অস্ট্রেলিয়ার উদার ও স্বাগত জানানোর ভাবমূর্তিকে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসাই বাড়ায় না, বরং কর দিয়ে দেশটির অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখে। এখন দেখার বিষয়, আবাসন সংকট ও রাজনৈতিক চাপ সামলাতে অস্ট্রেলিয়া সরকার কট্টরপন্থীদের এই দাবি মেনে নেয়, নাকি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় কোনো মধ্যপন্থা অবলম্বন করে।

