বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষা এবং ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে এক মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখলেন তারেক রহমান। আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় ফেরাই নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বিরল রেকর্ডের সাক্ষী হতে যাচ্ছে ‘জিয়া পরিবার’। বাবা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়ার পর এবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। রাজতন্ত্রের বাইরে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একই পরিবারের তিন সদস্যের দেশ পরিচালনা করার এই ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে তো বটেই, বিশ্ব রাজনীতিতেও এক অনন্য নজির।
জিয়া পরিবার থেকে তৃতীয় রাষ্ট্রনেতা : তারেক রহমানের হাত ধরে নতুন ইতিহাস
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়া পরিবারের অবদান ও প্রভাব অনস্বীকার্য। বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতার পাদপ্রদীপে আসেন। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন। তার হাত ধরেই বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়।
১৯৮১ সালে জিয়ার শাহাদাতের পর গৃহিণী থেকে রাজনীতিতে আসেন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ আপসহীন আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তিনবার রাষ্ট্র পরিচালনা করে তিনি নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। আর এবার, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তারেক রহমান বাবা-মায়ের উত্তরসূরি হিসেবে দেশ শাসনের ভার নিচ্ছেন।

রাজতন্ত্রহীন বিশ্বে তিন রাষ্ট্রনেতার বিরল রেকর্ড
বিশ্বের খুব কম রাজনৈতিক পরিবার আছে যেখানে তিন জন সদস্য রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান হয়েছেন। আধুনিক যুগে ভারতের নেহেরু-গান্ধী পরিবার (জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধী), পাকিস্তানের ভুট্টো পরিবার (জুলফিকার আলী ভুট্টো ও বেনজীর ভুট্টো—তবে তৃতীয় সদস্যের ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে), এবং শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসে পরিবারের এমন নজির রয়েছে। তারেক রহমানের শপথের মাধ্যমে জিয়া পরিবার এই অভিজাত তালিকায় বাংলাদেশের নাম খোদাই করতে যাচ্ছে।
১৭ বছরের নির্বাসন থেকে মসনদ : এক দুর্গম যাত্রার জয়গান
২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর তারেক রহমানকে দীর্ঘ সময় লন্ডনে নির্বাসিত থাকতে হয়েছে। তার অবর্তমানে দল এবং পরিবারের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে অসংখ্য ঝড়। গত ডিসেম্বরে মায়ের মৃত্যুর পর তিনি দেশে ফেরেন। হাজার হাজার মানুষের আবেগ আর প্রত্যাশার চাপে বিএনপি যে এবার নতুন শক্তিতে মাঠে নেমেছিল, নির্বাচনের ফলাফলই তার প্রমাণ। তারেক রহমান দেখিয়েছেন যে, আধুনিক প্রচারণা এবং তৃণমূলের সাথে ডিজিটাল ও সরাসরি সংযোগ কীভাবে একটি রাজনৈতিক দলকে ধ্বংসস্তূপ থেকে তুলে আনতে পারে।
এবারের মন্ত্রিসভা : প্রবীণ ও নবীনের মেলবন্ধন
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, তারেক রহমান এবার একটি ‘স্মার্ট ও দক্ষ’ মন্ত্রিসভা গঠন করতে চান। এবারের মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ প্রবীণ নেতাদের পাশাপাশি জায়গা করে নিতে পারেন জুলাই বিপ্লবের সাথে যুক্ত তরুণ নেতৃত্ব এবং দলের মেধাবী নবীনরা। নতুন মন্ত্রিসভার আকার খুব বেশি বড় হবে না বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। লক্ষ্য একটাই—দ্রুত প্রশাসনিক সংস্কার এবং ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা।
রাষ্ট্র পরিচালনায় তারেক রহমানের চ্যালেঞ্জসমূহ
ক্ষমতায় আসা যতটা কঠিন ছিল, বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেশ পরিচালনা করা তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারেক রহমানের সামনে প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জ হলো:
- অর্থনৈতিক সংস্কার : গত কয়েক বছরের ঋণের বোঝা ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা।
- সুশাসন ও বিচারহীনতা দূর করা : গত সরকারের আমলে হওয়া বৈষম্য দূর করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা।
- রাজনৈতিক সহাবস্থান : বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা।
জন আকাঙ্ক্ষা ও আগামীর বাংলাদেশ
দেশের মানুষ এবার কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন চায়নি, তারা চেয়েছিল গুণগত পরিবর্তন। তারেক রহমান তার নির্বাচনি প্রচারণায় ‘রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা’র কথা বারবার উল্লেখ করেছেন। সাধারণ ভোটাররা আশা করছেন, জিয়া পরিবারের তৃতীয় এই উত্তরসূরি তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে এক আধুনিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করবেন।
উপসংহার : এক নতুন দিগন্তের অপেক্ষায়
মঙ্গলবার বিকেলে বঙ্গভবনের দরবার হলে যখন তারেক রহমান শপথ নেবেন, তখন কেবল একটি শপথ বাক্যই উচ্চারিত হবে না, বরং পূর্ণ হবে একটি রাজনৈতিক বৃত্তের। বাবা ও মায়ের অসমাপ্ত কাজ এবং জনগণের দেওয়া বিপুল ম্যান্ডেট পালন করা এখন তারেক রহমানের প্রধান অগ্নিপরীক্ষা। বাংলাদেশের মানুষ এখন এক নতুন দিগন্তের অপেক্ষায়।

