দেশের সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং অনলাইন কনটেন্ট ব্লক ও ফিল্টারিং সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার’ (এনটিএমসি)-এর জন্য প্রায় ৯৫ কোটি টাকার নতুন সরঞ্জাম কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। গত ২০ মে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ-সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে এই কেনাকাটা এমন এক সময়ে সম্পন্ন হচ্ছে, যখন দেশের নজরদারি ও নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা কাঠামো নিয়ে জনমনে নানামুখী বিতর্ক ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

নতুন প্রকল্পে কী কী আধুনিক সরঞ্জাম কেনা হচ্ছে?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ‘কনটেন্ট ব্লকিং ও ফিল্টারিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ (পর্যায়-১)’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রকল্পের আওতায় এই সরঞ্জামগুলো কেনা হচ্ছে। অতিসংবেদনশীল কাজের প্রকৃতির কারণে উন্মুক্ত দরপত্রের পরিবর্তে ৯টি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমিত দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এর মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ঢাকার ধানমন্ডিভিত্তিক সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল ব্র্যান্ড পিএলসি’ এই কাজটি পেয়েছে। অনুমোদিত এই দর দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ২.৩৯ শতাংশ বেশি।
সরঞ্জামের তালিকায় যা থাকছে:
- নেক্সট জেনারেশন ফায়ারওয়াল: উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি অত্যাধুনিক ফায়ারওয়াল ডিভাইস।
- হাইব্রিড প্যাকেট ব্রোকার: দুটি মাল্টি ফাংশনাল হাইব্রিড প্যাকেট ব্রোকার।
- সুইচ ম্যানেজমেন্ট কার্ড: তিনটি বিশেষায়িত সুইচ ম্যানেজমেন্ট কার্ড।
- ডেটা সেন্টার আপগ্রেড: আংশিকভাবে সংযুক্ত ছয়টি ডেটা সেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক হার্ডওয়্যার ও সরঞ্জাম।
বিতর্ক ও এনটিএমসির পেছনের ইতিহাস
২০০৮ সালে মোবাইল অপারেটরদের অর্থায়নে এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের ভবনে ‘ন্যাশনাল মনিটরিং সেন্টার’ (এনএমসি) হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে নাম বদলে এটি ‘এনটিএমসি’ করা হয়।
দীর্ঘ সময় ধরে এই সংস্থাটির কার্যক্রম নিয়ে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নাগরিকদের ওপর নজরদারি এবং ফোনে আড়িপাতার প্রধান মাধ্যম হিসেবে এই সংস্থাকে ব্যবহার করার তীব্র সমালোচনা ছিল।
এমনকি ২০২৩ সালে ইসরাইলি পত্রিকা ‘হারেৎজ’ তাদের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করেছিল যে, ২০২২ সালে এনটিএমসি ইসরাইলের সাবেক এক গোয়েন্দা কমান্ডারের কোম্পানির কাছ থেকে ‘স্পিয়ারহেড’ নামক ক্ষতিকর নজরদারি সিস্টেম কিনেছিল। যদিও তৎকালীন সরকার সরাসরি ইসরাইল থেকে প্রযুক্তি কেনার বিষয়টি নাকচ করলেও নিরাপত্তার স্বার্থে নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কথা স্বীকার করেছিল।
জাতিসংঘের সুপারিশ, ৯৪ নাগরিকের দাবি ও আইনি সংস্কার
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনেও মানবাধিকার সুরক্ষায় এই সংস্থাটিকে বিলুপ্ত করার জোর সুপারিশ করা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর দেশের ৯৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক এনটিএমসি ভেঙে দেওয়ার দাবি জানান।
পরবর্তীতে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে এনটিএমসি বিলুপ্তির অধ্যাদেশ পাস করে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট’ নামে নতুন কাঠামো গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর চলতি বছরের এপ্রিলে নজরদারির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা রেখে আইন সংশোধন করা হয়।
সরকারের বক্তব্য ও সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ, ২০২৫
সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, নতুন এই আধুনিক সরঞ্জামগুলো মূলত ইন্টারনেট নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর আলোকে সহিংসতা, গুজব কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে ব্যবহৃত হবে।
সরকারি সূত্রের দাবি: সংশোধিত নতুন আইন অনুযায়ী এখন ঢালাওভাবে আড়িপাতা বা নজরদারির সুযোগ নেই। যেকোনো পদক্ষেপের ক্ষেত্রে কঠোর আইনি প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে।
উপসংহার
ডিজিটাল যুগে মানুষের জীবনের একটি বড় অংশই এখন অনলাইন বা ইন্টারনেট-নির্ভর। নিত্যপণ্যের বাজারদর কিংবা মূল্যস্ফীতির চিন্তায় জর্জরিত সাধারণ নাগরিক দিনশেষে ইন্টারনেটে নিজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা চান। রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থে সাইবার নিরাপত্তা যেমন জরুরি, তেমনি নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের এই নতুন প্রযুক্তি ও কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম ক্রয়ের উদ্যোগ সত্যিই সাইবার অপরাধ দমনে ব্যবহৃত হবে, নাকি তা পুরোনো নজরদারি সংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটাবে—তা সময়ই বলে দেবে।

