বাংলাদেশে ২০১৭ সালের পর থেকে আশ্রিত রোহিঙ্গা সংকট দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। একদিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে নতুন করে অনুপ্রবেশের শঙ্কা ও ক্যাম্পে উচ্চ জন্মহারের কারণে শরণার্থীর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলের মানবিক সহায়তার তহবিল বা বাজেট আশঙ্কাজনক হারে সংকুচিত হয়ে আসছে। বুধবার (২০ মে ২০২৬) ঢাকায় জাতিসংঘের দপ্তরে ঘোষিত যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার নতুন বাজেট বিশ্লেষণে এই উদ্বেগজনক চিত্রই ফুটে উঠেছে।
২০২৫ সালের তুলনায় এবার বাজেট এক ধাক্কায় ২৬ শতাংশ কম ধরা হয়েছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য এক নতুন সামাজিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে যাচ্ছে।

সংখ্যার বিস্ফোরণ: ক্যাম্পে বছরে জন্ম নিচ্ছে ৩০ হাজার শিশু
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৫০ হাজার (সাড়ে ১২ লাখ)। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় আট লাখ।
- উচ্চ জন্মহার: কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ হাজার নতুন শিশুর জন্ম হচ্ছে।
- মিয়ানমারের নতুন অস্থিরতা: মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র মধ্যে চলমান তুমুল সংঘর্ষ ও নির্যাতনের কারণে দেশটিতে অবশিষ্ট থাকা রোহিঙ্গারাও প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পালিয়ে আসছে।
২০২৬ সালের জেআরপি (JRP) বাজেট: কমছে বরাদ্দের অঙ্ক
পরিসংখ্যান বলছে, শরণার্থীর সংখ্যা বাড়লেও আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর তহবিল জোগাড়ের হার কমছে। ২০২৬ সালের জেআরপি বাজেটের তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
জেআরপি বাজেট ও সুবিধাভোগীর তুলনামূলক সারণী:
| বছর | মোট বাজেট (ডলার) | সুবিধাভোগীর সংখ্যা (রোহিঙ্গা ও স্থানীয়) | বাজেটের ঘাটতি/হ্রাস |
|---|---|---|---|
| ২০২৫ | ৮৫ কোটি ২০ লাখ ডলার | ১৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষ | – |
| ২০২৬ | ৭১ কোটি ডলার | ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষ | ২৬% বা সাড়ে ২৫ কোটি ডলার হ্রাস |
বাজেটের বাইরে বড় জনগোষ্ঠী: ২০২৬ সালের জেআরপি অনুযায়ী, বর্তমানে ক্যাম্পে ও স্থানীয় পর্যায়ে ১৮ লাখ ৯০ হাজার মানুষ চরম চাহিদাগ্রস্ত। কিন্তু ৭১ কোটি ডলারের এই সীমিত বাজেটের কারণে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ সম্পূর্ণ বরাদ্দের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
২০২৬ সালের বাজেটের অভ্যন্তরীণ বণ্টন
চলতি বছরের জন্য চাওয়া ৭১ কোটি ডলারের মধ্যে:
- রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ: ৬৭ কোটি ৪৩ লাখ ডলার।
- স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ: ৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার (মোট ৩ লাখ ৭ হাজার স্থানীয় বাসিন্দা এর আওতাভুক্ত)।
- খাদ্য নিরাপত্তা (সর্বোচ্চ খাত): বরাদ্দের সবচেয়ে বড় অংশ—২৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার রাখা হয়েছে খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য।
বাংলাদেশে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের মোট চাহিদার বিপরীতে গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত মাত্র ৬৩ শতাংশ তহবিল জোগাড় করা সম্ভব হয়েছে। অবশিষ্ট তহবিল সংগ্রহ করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
শেষ কথা: বাংলাদেশের কাঁধে দীর্ঘমেয়াদী বোঝা?
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন নতুন যুদ্ধ ও সংকটের (যেমন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন পরিস্থিতি) কারণে বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজর এখন রোহিঙ্গা সংকট থেকে কিছুটা দূরে সরে যাচ্ছে। তবে লাখ লাখ শরণার্থীর মৌলিক চাহিদা পূরণে ঘাটতি দেখা দিলে তা ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি, মানব পাচার এবং স্থানীয় সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৬ সালের এই চুক্তি ও বাজেট সংকোচন বাংলাদেশকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় এখন কেবল আন্তর্জাতিক সাহায্যের ওপর নির্ভর না করে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে স্থায়ী প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে হবে।

