বলিউডের আকাশে কত নক্ষত্রই তো জ্বলেছে, কিন্তু মধুবালার মতো এমন স্নিগ্ধ অথচ প্রখর আলো আর কেউ কি ছড়াতে পেরেছে? হলিউডের মেরিলিন মনরোর সাথে তুলনা করা হলেও মধুবালা ছিলেন অনন্য, তুলনাহীন। পর্দার ‘মুঘল-ই-আজম’ ছবিতে যে আনারকলি সেলিমের প্রেমে জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলেন, বাস্তবের মমতাজ জাহান দেহলভী বা মধুবালার জীবনও ছিল ঠিক তেমনই এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি। জন্ম ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে, অথচ সারা জীবন তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো একফোঁটা সত্যিকারের ভালোবাসার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, এটাই ছিল মধুবালার জীবনের নির্মম সত্য।
দারিদ্র্য থেকে ‘ভেনাস’ হয়ে ওঠার লড়াই
১৯৩৩ সালে দিল্লির এক অতি সাধারণ ঘরে জন্ম মধুবালার। বাবার চাকরি চলে যাওয়ার পর পরিবারের ১১ জন সদস্যের মুখে অন্ন জোগাতে মাত্র ৯ বছর বয়সেই পা রাখেন বোম্বের চলচ্চিত্র জগতে। শৈশবের সেই লড়াই তাঁকে কঠোর পরিশ্রমী ও ডিসিপ্লিনড করে তোলে। পরিচালক ও প্রযোজকেরা খুব দ্রুতই তাঁর প্রতিভা বুঝতে পারেন। দেবীকা রানি তাঁর নাম দেন ‘মধুবালা’। ১৯৪৭ সালে ‘নীল কমল’ দিয়ে রাজ কাপুরের বিপরীতে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তিনি জানান দেন- এক নতুন সম্রাজ্ঞীর আবির্ভাব হয়েছে।

দিলীপ কুমার : এক অসমাপ্ত মহাকাব্যের নাম
১৯৫১ সালে ‘তারানা’ ছবির সেটে শুরু হয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত প্রেমকাহিনি-মধুবালা ও দিলীপ কুমার। সাত বছরের সেই গভীর সম্পর্ক কেবল সিনেমার স্ক্রিপ্টে সীমাবদ্ধ ছিল না। কিন্তু এই প্রেমের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ান মধুবালার বাবা আতাউল্লাহ খান। ‘নয়া দৌড়’ ছবিকে কেন্দ্র করে একটি আইনি মামলায় দিলীপ কুমার মধুবালার বাবার বিপক্ষে সাক্ষ্য দিলে সম্পর্কের ফাটল আর জোড়া লাগেনি। ইগো, জেদ আর অভিমানের লড়াইয়ে বলি হলো তাঁদের সাত বছরের প্রেম। দিলীপ কুমার চেয়েছিলেন মধুবালা তাঁর পরিবার ছেড়ে চলে আসুক, কিন্তু পিতৃভক্ত মধুবালা তা পারেননি।
‘মুঘল-ই-আজম’ : পর্দার রোমান্স বনাম বাস্তবের ঘৃণা
হাস্যকর শোনালেও সত্য যে, যখন ‘মুঘল-ই-আজম’ ছবির সেই কালজয়ী প্রেমের দৃশ্যগুলো শুটিং হচ্ছিল, তখন মধুবালা ও দিলীপ কুমার একে অপরের সাথে কথা পর্যন্ত বলতেন না। সেলিম-আনারকলির সেই মহাকাব্যিক রসায়নের আড়ালে ছিল দুই ভাঙা হৃদয়ের আর্তনাদ। ভারী শিকল পরে আনারকলির সেই বন্দিদশার দৃশ্যগুলো ছিল মধুবালার জন্য শারীরিক যন্ত্রণার এক চরম পরীক্ষা। হৃৎপিণ্ডে ছিদ্র নিয়ে তিনি যে নিবেদন দেখিয়েছিলেন, তা আজও অভিনেতাদের জন্য পাঠ্য।
কিশোর কুমারের সাথে সংসার ও অসুস্থতার ছায়া
দিলীপ কুমারের সাথে বিচ্ছেদের পর অভিমান থেকেই কি না, ১৯৬০ সালে তিনি বিয়ে করেন কিংবদন্তি কিশোর কুমারকে। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা তাঁর পিছু ছাড়েনি। চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর হার্টের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। চিকিৎসকেরা জবাব দিয়ে দিয়েছিলেন। বিয়ের পর একাকীত্ব আর অসুস্থতা নিয়েই দীর্ঘ ৯ বছর শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল তাঁকে।

কেন মধুবালা অমর?
মধুবালার সৌন্দর্য কেবল চামড়ার গভীরতায় ছিল না, ছিল তাঁর সপ্রতিভ অভিনয়ে। তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে অগ্রবর্তী। ১৯৫২ সালে আমেরিকার ‘থিয়েটার আর্টস’ ম্যাগাজিন তাঁকে ‘বিগেস্ট স্টার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ তকমা দিয়েছিল। তাঁর রহস্যময় হাসি আর বিষাদভরা চোখ আজও দর্শককে চুম্বকের মতো টানে।
‘আমি বাঁচতে চাই’ : একটি অপূর্ণ হাহাকার
অসুস্থতার শেষ দিনগুলোতেও মধুবালা বলতেন, “আমি বাঁচতে চাই।” তাঁর সেই আকুতি ছিল জীবনের প্রতি অদম্য তৃষ্ণার প্রকাশ। কিন্তু ভাগ্যের লিখন ছিল অন্যরকম। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৩৬ বছর বয়সে এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন তিনি। তাঁর মৃত্যু কেবল একজন অভিনেত্রীর প্রস্থান ছিল না, ছিল এক যুগের সমাপ্তি।
উপসংহার : মধুবালা এক চিরন্তন অনুভূতির নাম
আনারকলির প্রেম বাস্তবেও অপূর্ণই ছিল। পর্দার সেলিম যেমন আনারকলিকে বাঁচাতে পারেননি, বাস্তবের দিলীপ কুমার বা কিশোর কুমারও মধুবালার হৃদয়ের শূন্যতা বা অসুস্থতা ঘোচাতে পারেননি। তবে মধুবালার এই ট্র্যাজেডিই তাঁকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে। তিনি চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর অভিনীত প্রতিটি ফ্রেম আর সেই মোহময়ী হাসি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মধুবালা কেবল একজন নায়িকা নন, তিনি একটি চিরন্তন অনুভূতির নাম।

