বার্তাবাংলা রিপোর্ট :: অভাবের সংসারে জন্ম। শুধু কষ্টই যেন তার জীবনসঙ্গী। কখনও অনুভব করতে পারেনি সুখ কী? কষ্টের সংসারের রং পাল্টানোর স্বপ্ন নিয়ে গার্মেন্টসে এক মনে কাজ করে যায় রানু। কিন্তু কষ্ট লাঘবের কোন উপায় খুঁজে পায়না। তাই সামান্য জমি বিক্রির টাকা এবং গার্মেন্টসে কাজ করে নিজের জমানো শেষ সম্বলটুকুর বিনিময়ে বাংলাদেশ থেকে লেবাননের উদ্দেশে পাড়ি জমান মিরপুর বাউনিয়াবাঁধ এলাকার রানু আক্তার। মনের গহীনে জমানো একরাশ রঙিন স্বপ্ন। সে জানতো যে, লেবাননে গিয়ে তাকে নার্সিং-এর কাজ করতে হবে এবং ভাল বেতন পাবে। কিন্তু লেবানন বিমান বন্দর থেকেই শু হয় তার ভোগান্তি বিমান বন্দরে পাঁচ ঘণ্টা বসে থাকার পর তাকে নিতে আসে লেবাননের এজেন্ট। ওখান থেকেই ফিকে হতে শুরু করে তার স্বপ্নগুলো। আর এ স্বপ্ন একেবারে ধূলিসাৎ হয়ে যায় তার থাকার জায়গায় গিয়ে। সেখান থেকেই সে জানতে পারে তাকে বাসা-বাড়িতে কাজ করার জন্য পাঠানো হয়েছে। এটা মেনে নিতে কষ্ট হলেও অন্য উপায় না থাকায় বাসা-বাড়ির কাজ শুরু করে রানু। ধোয়া-মোছার কাজের পাশাপাশি প্রায়শই অনৈতিক কাজের প্রস্তুাব আসতে থাকে। তাদের সেই অনৈতিক প্রস্তাবে সাড়া না দেয়ার ফলে রানুর ভাগ্যে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। প্রতিনিয়ত শিকার হতে হয় অমানবিক নির্যাতনের। বিদেশে অসহায় রানু নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাংলাদেশে মায়ের কাছে ফোন করে কান্নাকাটি করতে থাকে। লোক মাধ্যমে জানতে পেরে রানুর মা দ্বারস্থ হন বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা জয়নাল আবেদীন জয় এর সাথে। ফোনে রানুকে বিভিন্ন শান্তনা দিয়ে জয়নাল আবেদীন জয় বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং মাননীয় সরকাররের পররাষ্ট্র মন্ত্রী দিপু মুনির সাথে ২৫/০৩/২০০৯ইং সাাত করে নির্যাতনের শিকার রানুকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য অনুরোধ জানান। এছাড়া লেবাননে রানুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় জয়নাল আবেদীন জয়। অবশেষে অসহায় রানু বাংলাদেশে ফিরে আসে গত ১৭ই,মে,২০০৯ইং সরেজমিনে রানুর সাথে কথা বলে জানা যায় নির্যাতিত হওয়ার সমস্ত ঘটনা। জন্মের আগেই বাবা হারানো রানুর মা তার দুই মেয়েকে নিয়ে বসতি গড়েন মিরপুর বাউনিয়া বাঁধের বস্তি এলাকায়। টানাটানির সংসারে গার্মেন্টস কর্মী রানুর মা সরকার থেকে বাস করার জন্য একটুকরো জমি বরাদ্দ পেয়েছিলেন। বয়স হয়ে যাওয়ায় জমি নিয়ে যাতে মেয়েদের মধ্যে কোন বিরোধের সৃষ্টি না হয় এবং ঋণ ঝামেলা থেকে মুক্তির জন্য সেই জমিটুকু বিক্রি করে টাকা দুই মেয়ের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেন। জমি বিক্রির দিন রানুর কান্নাকাটিতে সমবেদনা জানাতে আসা অনেকের মধ্যে ছিলেন প্রতিবেশী জামসিদা। সে রানুকে সাহস যোগায়। এরকম আরো অনেক বাড়ি করার সামর্থ্য রানুর হবে বলে সাত্ত্বনা দেয়। এভাবে আর বাড়ি হারানোর শোকে কান্নাকাটি করতে হবে না। রানুর কাছে বাড়ি বিক্রির টাকা আছে এটা জানতে পেরে রানুকে বিদেশ যাওয়ার টোপ ফেলে জামসিদা। রানুকে লোভ দেখিয়ে বলে তোকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে মরিশাসে পাঠিয়ে দিলে তোর আর কোন অভাব থাকবে না। কিন্তু রানু মেয়ে মানুষ হিসেবে বিদেশ যাওয়ার জন্য রাজি না হলেও জামসিদা প্রতিনিয়ত রানুকে ফুসলাতে থাকে। প্রতিনিয়ত বোঝায় যে, ওখানে গিয়ে ভাল কাজ করবি, টাকা কামাবি, সুন্দরভাবে চলতে পারবি। এক সময় জামসিদার ফাঁদে পা দেন রানু। পরিবারের সবাইকে রাজি করিয়ে ফেলেন। এর মধ্যে জামসিদা রানুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় টঙ্গীর দত্তপাড়ার হাজী মোঃ মকবুল হোসেনের সাথে। রানুর বিদেশ যাওয়ার সমস্ত প্রসেসিং তিনিই করবেন বলে রানুকে জানায় জামসিদা। রানুর পরিবার থেকে বিদেশ গিয়ে রানু কি কাজ করবে জানতে চাইলে নার্সের কাজ করতে হবে বলে জানায় মকবুল হোসেন। তা না হলে মাছের প্যাকেটের গায়ে লেভেল বসানোর কাজ করতে হবে। নার্সিং-এর কোন ট্রেনিং নেই জানিয়ে রানু মাছের গায়ে লেভেল বসানোর কাজ করতে আগ্রহী জানালে মকবুল মিয়া সেটাই হবে বলে সায় দেয়।
২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দু’ একদিনের মধ্যে মরিশাস পাঠানো হবে জানিয়ে দ্রুত পাসপোর্ট এবং মেডিকেল করানোর জন্য দশ হাজার টাকা নেয় এবং একদিনের মধ্যেই এসব কাজ সম্পূর্ণ করে ফেলে। মার্চ মাসে হঠাৎ একদিন কালকের মধ্যেই নব্বই হাজার টাকা দিতে হবে তা না হলে মরিশাসে যেতে অনেক দেরি হবে বলে টাকার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। টাকা নিয়ে ২মাস ১৫দিনের মধ্যে মরিশাসে পাঠানোর নিশ্চয়তা দেন মকবুল হোসেন। কিন্তু এর কিছুদিন পর তিনি রানুকে জানান যে, মরিশাসে আপাতত কোনো লোক নিচ্ছেনা তাই তাকে লেবানন পাঠানো হবে। লেবানন মরিশাসের চেয়ে অনেক ভালো দেশ। ওখানে আয়ের সুযোগ আরও বেশি বলেও জানান তিনি মকবুল হোসেনের বেঁধে দেয়া সময় শেষ হয়ে গেলেও রানুর বিদেশ যাওয়া হয়না। আজ না কাল, আবার কখনো আগামী মাস এভাবে সময় পেণ করতে করতে প্রায় ৯ মাস পর ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ে রানুর। ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর লেবাননের উদ্দেশে বাংলাদেশ থেকে রওয়ানা হন রানু। দুবাইয়ে দু’দিন যাত্রা বিরতির পর চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি লেবাননে পৌঁছান রানু। লেবাননে নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন রানু। ওখানকার বাসার মালিকের কথা না মানায় তার শরীরে ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়। মাঝে মাঝে চাবুক দিয়ে পেটানো হতো। আবার কখনও কখনও খুব ভাল ব্যবহার করে তাদের কথা মেনে চলার অনুরোধ করা হতো তাদের কথা মত চললে টাকা পয়সার কোন সমস্যা হবেনা, সে যা চাইবে তাই দেয়া হবে। কিন্তু রানু ছিলেন চিরায়ত বাঙালি নারীর প্রতীক মরে গেলেও তিনি তার সতীত্ব নষ্ট হতে দেবেন না এই পণ করেছিলেন। প্রতিদিন এভাবে নির্যাতনের শিকার রানু শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন এই দোযখ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। রানু লেবানন থেকে লুকিয়ে মালিকের অগোচরে বাংলাদেশে ফোন করতেন। সেভাবেই একদিন হাজী মকবুল হোসেনকে ফোন করে তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করার কথা বললে মকবুল তাকে আশাব্যঞ্জক কোন কথা না শুনিয়ে বলে, আমার কাজ ছিল তোকে লেবানন পাঠানো। সেখানে কি হলো না হলো সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। অন্য আরেক দিন ফোন করে রানু কান্নাকাটি করলে সে শাসিয়ে বলে তোর মায়ের তো অনেক টাকা। আমাকে পাঁচ লাখ টাকা দিলে আমি তোকে উদ্ধার করব। এদিকে মকবুল হোসেনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া তাদের প্রতিবেশী জামসিদার সাথে রানুর পরিবার থেকে বারবার যোগাযোগ করা হলে সে জানায় আমার সাথে কথা বলে লাভ নেই। যা বলার মকবুলের কাছে গিয়ে বল। কিন্তু রানুকে ফিরিয়ে আনার জন্য মকবুলকে বারবার বলার পরও সে কোন পদপে নেয়নি। উল্টো নানাভাবে শাসিয়েছে জামসিদাকে দিয়ে সাদা কাগজে স্বার নেয়ার চেষ্টা চালায়। এভাবে প্রতিনিয়ত বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রতারিত, নির্যাতিত হতে থাকা মানুষ গুলো কবে মুক্তি পাবে এসব প্রতারক চক্রের হাত থেকে? অবশেষে ইমা রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, জয়নাল আবেদীন জয় -এর সার্বিক সহযোগীতায় ১৭ই মে,২০০৮ইং সালে অসুস্থ্য অবস্থায় রানু আক্তাকে জীবিত দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।
২২ই ফেব্রুয়ারী,২০১২ইং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের সহযোগীতার জন্য ‘বাংলাদেশ মাইগ্রেন্টস ফাউন্ডেশন’ (বিএমএফ) -এর চেয়ারম্যান, জয়নাল আবেদীন জয় পূর্ণবাসন লোনের জন্য অনেক চেষ্টা করার পর ব্যাংক থেকে জানিয়ে দেয় জমির দলিলের খারিজসহ কাগজপত্রাদী ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য। কিন্তু হায়! হতভাগ্য রানু আক্তারের কোন জমি নেয়, কোথা থেকে জমির কাগজ দিবে সে! অবশেষে ব্যাংকের সহযোগীতা না পেয়ে দিশে হারা রানু পাশে কেউ দাঁড়ালোনা। নারী অভিবাসীকর্মী রানু আক্তারের দূর্বিসহ অবস্থা বিবেচনা করে; ‘বাংলাদেশ মাইগ্রেন্টস ফাউন্ডেশন’ (বিএমএফ) এর চেয়ারম্যান, জয়নাল আবেদীন জয় ছিট-কাপড়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায় ১০,০০০/-(দশ হাজার) টাকা দিয়ে সহযোগীতা করে। কিছু দিন পর অসুস্থ স্বামীর কিডনী নষ্ট হয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে রানু আবারও ‘বাংলাদেশ মাইগ্রেন্টস ফাউন্ডেশন’ (বিএমএফ) -এর সহযোগীতা কামনা করে। কিন্তু অভিবাসী কর্মীদের ডনেশনকৃত অর্থে ‘বাংলাদেশ মাইগ্রেন্টস ফাউন্ডেশন’ (বিএমএফ) অভিবাসী কর্মীদের ন্যায্য অধিকার রক্ষার্থে বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছে ২০১০ইং সাল হইতে। শেষ পর্যন্ত বিএমএফ’ এর সহায়তায় সামান্য কিছু টাকা দিয়ে স্বামীর চিকিৎসা করছিল রানু। ২-৪ বছরের দুই মেয়ে, অসুস্থ্য স্বামীকে নিয়ে দিশেহারা রানু আজ ২৮ই আগষ্ট,২০১৩ইং সকাল ১০:০০ঘটিকায় চিরদিনের জন্য বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল স্বামী সেলিম’কে হারালো। দাফনের খরচ জোগাড় করতে দুই মেয়েকে নিয়ে রানু ‘বাংলাদেশ মাইগ্রেন্টস ফাউন্ডেশন’ (বিএমএফ) অফিসে ছুঁটে এসে কাঁন্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
‘বাংলাদেশ মাইগ্রেন্টস ফাউন্ডেশন’ (বিএমএফ)-এর চেয়ারম্যান, জয়নাল আবেদীন জয়, হতভাগ্য নারী অভিবাসীকর্মী রানু আক্তারের মৃত: স্বামীর দাফন কাজ সম্পূর্ন করার খরচ এবং দুই মেয়ের ভরণ-পোষনের দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, বিভিন্ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের কাছে আবেদন, আসুন! সবাই মিলে নারী অভিবাসীকর্মী রানু আক্তারের পাশে দাঁড়ায়।
