চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকা আবারও জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে। একটানা কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট, দোকানপাট, ঘরবাড়ি পানির নিচে। শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি পরিণত হয়েছে ছোটখাটো নদীতে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো মানুষ।
চট্টগ্রামে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, গড়ে প্রতি বছর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৬-৭ মিলিমিটার করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে গত ৩০ বছরে বর্ষণ বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। এর ফলে শহরাঞ্চলে অতিবৃষ্টি, অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাস এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ক্রমেই বাড়ছে।

জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ১.৩ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। এর একটি বড় অংশ চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ।
নগরের অব্যবস্থাপনা
চট্টগ্রাম নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার সক্ষমতা নগরীর চাহিদার তুলনায় অনেক কম। সিটি কর্পোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রামে প্রায় ৫৭টি প্রধান খাল রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকই অবৈধ দখল ও ময়লার কারণে কার্যত মৃতপ্রায়।
স্থানীয় বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, “একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় কোমরসমান পানি জমে যায়। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, ব্যবসা নষ্ট হয়। অথচ সমাধানের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।”
রিকশা চালক আলমগীর হোসেন অভিযোগ করে বলেন, “আমরা প্রতিদিন পানির মধ্যে গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে কাজ করি। যাত্রী কমে যায়, আয়ও কমে যায়।”
অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি
জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS) এর এক জরিপে দেখা গেছে, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার কারণে বছরে গড়ে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।

স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার কারণে ডায়রিয়া, আমাশয়, চর্মরোগ ও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অন্তত ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
বিশেষজ্ঞ মতামত
পরিবেশবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সংকট। কিন্তু নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। পরিকল্পিত নগরায়ণ ও টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা না করলে চট্টগ্রাম নগর অচল শহরে পরিণত হবে।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সেলিম হোসেন বলেন, “মুরাদপুরে যা ঘটছে তা শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অস্বাভাবিক বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম পুরোপুরি ঝুঁকির মুখে।”
সমাধান প্রস্তাব
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন।
- খাল পুনঃখনন ও দখলমুক্তকরণ : চট্টগ্রামের সব খাল পুনরুদ্ধার করা জরুরি।
- আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা : বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
- বর্জ্য-ব্যবস্থাপনা : নালা-নর্দমা যাতে আবর্জনায় ভরে না যায়, সে জন্য কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দরকার।
- নগর পরিকল্পনা : এলোমেলো ভবন নির্মাণ বন্ধ করে নগর পরিকল্পনা অনুযায়ী উন্নয়ন করতে হবে।
- আন্তর্জাতিক সহযোগিতা : জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহ করে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করতে হবে।
উপসংহার
মুরাদপুরে জলাবদ্ধতা কেবল একটি দিনের দুর্ভোগ নয় বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও নগর অব্যবস্থাপনার এক নগ্ন চিত্র। তাই এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে আগামী দশকে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

