মাত্র ২৩ বছরের এক সংক্ষিপ্ত অথচ কালজয়ী সাহিত্যজীবন ছিল বাংলা সাহিত্যের ‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলামের। তাঁর ক্ষুরধার লেখনী একদিকে যেমন পরাধীন বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিল, অন্যদিকে তেমনি নিজের ব্যক্তিগত জীবনে এনেছিল চরম অর্থকষ্ট আর টানাপোড়েন। সরকারি চাকরি বা বিকল্প কোনো আয়ের উৎস না থাকায়, বই লিখে পাওয়া অর্থই ছিল কবির একমাত্র সম্বল। তবে অতিমাত্রায় খেয়ালি ও হিসেবহীন হওয়ায় তাঁর সংসারে অভাব লেগেই থাকত। আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ, জাতীয় কবির জন্মদিনে তাঁর বই প্রকাশ, গ্রন্থস্বত্ব বিক্রি আর রয়্যালটি ঘিরে থাকা কিছু আনন্দ এবং দুঃখজাগানিয়া ইতিহাস নিয়ে এই বিশেষ আয়োজন।

‘ব্যথার দান’ থেকে ‘অগ্নিবীণা’
১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। মাত্র ২৩ বছর বয়সে নজরুলের প্রথম বই ‘ব্যথার দান’ প্রকাশিত হয়। কলকাতার মেটকাফ প্রেস থেকে ১ হাজার ১০০ কপি মুদ্রিত এই গল্পগ্রন্থটির দাম ছিল দেড় টাকা। তৎকালীন ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী, মামলা এড়াতে বই প্রকাশের এক মাসের মধ্যে সরকারি দপ্তরে এক কপি জমা দিতে হতো।
একই বছর অক্টোবরে প্রকাশিত হয় বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ এবং প্রবন্ধ সংকলন ‘যুগবাণী’। এই দুটি বই প্রকাশের পেছনে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর গল্প:
- নামহীন প্রকাশক: বই দুটির মূল উদ্যোক্তা ছিল অরবিন্দ ঘোষের ‘আর্য পাবলিশিং হাউস’। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের রাজরোষ ও মামলার ভয়ে প্রথম মুদ্রণে তারা নিজেদের নাম ছাপাতে সাহস পায়নি। ফলে বাধ্য হয়ে কবি নিজেই প্রকাশক হিসেবে নিজের নাম ব্যবহার করেন।
- অবনীন্দ্রনাথের ছোঁয়া: ‘অগ্নিবীণা’র প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদপট এঁকে দিয়েছিলেন বিখ্যাত শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রথম সংস্করণের ২ হাজার ২০০ কপি দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ায়, কবি যখন কারাগারে, তখনই বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ বাজারে আসে এবং দাম করা হয় পাঁচ সিকা।
নিষিদ্ধ বইয়ের চোরাবাজার ও সংসারের আলো
বিদ্রোহের আগুন জ্বালানো নজরুলের ‘বিষের বাঁশী’ ও ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থ দুটি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা বই দুটির চাহিদা আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রেসের এদিক-সেদিক লুকিয়ে রাখা ছাপানো ফর্মাগুলো গোপনে বাঁধাই করে তরুণ বিপ্লবীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হতো। এই নিষিদ্ধ বইয়ের বিক্রির টাকা থেকে নজরুলের পরিবার তীব্র আর্থিক সংকটের দিনে কিছুটা স্বস্তির মুখ দেখেছিল।
ডিএম লাইব্রেরির প্রতারণা ও মোটরগাড়ির গল্প
১৯২৬ সালে কলকাতার বিখ্যাত ‘ডিএম লাইব্রেরি’র মালিক গোপালদাস মজুমদার নজরুলের সব বই প্রকাশের একক দায়িত্ব নেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নিয়মিত টাকা পরিশোধের। কিন্তু বাস্তবে তিনি হিসাবপত্র দিতে গড়িমসি শুরু করেন। ক্ষুব্ধ নজরুল তৎকালীন নামী সলিসিটর নির্মলচন্দ্রের মাধ্যমে উকিল নোটিশ পাঠালে প্রকাশকের হুঁশ ফেরে।
কিন্তু এই সমঝোতার সময় কবি একটি মস্ত বড় ভুল করে বসেন। তিনি ‘অগ্নিবীণা’র স্থায়ী স্বত্ব ডিএম লাইব্রেরির কাছে মাত্র ২ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন। সেই নগদ টাকা দিয়ে কবি একটি মোটরগাড়ি কিনেছিলেন। অথচ গত শতকের ষাটের দশক পর্যন্ত অন্তত ১৮টি সংস্করণ বের হওয়া ‘অগ্নিবীণা’ ছিল নজরুলের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বই, যার স্বত্ব হারিয়ে কবি দীর্ঘমেয়াদে বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন।
ঋণের দলিল ও মনোরঞ্জনের মহানুভবতা
১৯৩৯ সাল নাগাদ নজরুলের পারিবারিক অর্থকষ্ট চরম আকার ধারণ করে। বাধ্য হয়ে তিনি সলিসিটর অসীমকৃষ্ণ দত্তের কাছ থেকে চার হাজার টাকা ঋণ নেন। কিন্তু এই ঋণের শর্ত ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর। চুক্তিনামায় লেখা ছিল, ঋণ শোধ না হওয়া পর্যন্ত গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে নজরুলের গানের সমস্ত রয়্যালটি সরাসরি অসীমকৃষ্ণ বাবু পাবেন। এর মাত্র দুই বছরের মাথায় কবি চিরতরে নির্বাক ও অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই দেনা আদৌ শোধ হয়েছিল কি না, তা আর দেশবাসী কোনোদিন জানতে পারেনি।
তবে এই নির্মমতার ভিড়েও মানবতা হারিয়ে যায়নি। নজরুলের ‘মরুভাস্কর’ গ্রন্থের মুদ্রণস্বত্ব ছিল কলকাতার কালিকা টাইপ ফাউন্ড্রির মালিক মনোরঞ্জন চক্রবর্তীর কাছে। কবির চরম দুর্দিনে এই দরদি মানুষটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বইটির সমস্ত স্বত্ব নজরুলের পরিবারের কাছে বিনাশর্তে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
উপসংহার
কাজী নজরুল ইসলামের বই প্রকাশের এই ইতিহাস কেবল কাগজের হিসাব নয়, বরং এটি এক কালজয়ী লেখকের সৃষ্টিসুখের আনন্দ এবং জীবনের রূঢ় বাস্তবতার এক নির্মম দলিল। যিনি পুরো জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন, জীবনের শেষভাগে এসে তাঁর সৃষ্টিই অন্যের বাণিজ্যিক শিকলে বন্দি হয়েছিল, যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক চিরন্তন দুঃখজাগানিয়া অধ্যায়।

