বার্তাবাংলা ডেস্ক »

ভালোবাসা মানে বহমানতা। ভালোবাসা মানে গোটা জীবন। তার জন্য আবার নির্দিষ্ট একটা দিন কেন? যে দিনের উল্টোপিঠে আছে ভালোবাসার নির্মমতা আর নিষ্ঠুরতার ইতিহাস, সেটাকে ঘটা করে পালন করারই বা কী আছে! কিন্তু এই কথাগুলো নিয়েও মতান্তর আছে। থাকবে। থাকাটা খুব স্বাভাবিক।

কিন্তু অস্বাভাবিক হচ্ছে ভালোবাসা নিয়ে বাণিজ্যিক উন্মাদনা। আধুনিক পৃথিবীর অতিবাণিজ্যিকী করণে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো। বিশেষ দিনে ভালোবাসা এখন ‘পণ্যায়ন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে! বাঙালির আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবস্থার পরিবর্তনের পর তার ভালোবাসারও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ হয়েছে। অথচ বাঙালির ভালোবাসা উৎসারিত হয়েছে তার হৃদয় থেকে। শুধু প্রেমিকার জন্য প্রেমিকের ভালোবাসা নয়। নয় তার উল্টোটাও। বাঙালির ভালোবাসা তার দেশের জন্য। মানুষের জন্য। তার ভাষার জন্য। তার শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্য।

‘যে দেশের মানুষ তার ভাষার জন্য রক্ত দেয়। যে দেশের মানুষ তার স্বাধীনতার জন্য রক্ত দেয়। যে দেশের স্থপতি তাঁর শক্তির জায়গা খুঁজে পায় মানুষের ভালোবাসায়। সে দেশের মানুষের ভালোবাসা আনুষ্ঠানিকতার মোড়কে পণ্য হয়ে কোন এক বিশেষ দিনে বিক্রি হতে পারে না।’
১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। কিন্তু সেই ভালোবাসার আগ্রাসন বাঙালি টের পেতে শুরু করলো গত শতাব্দির আশির দশকের মাঝামাঝি। সেটা সুকৌশলে। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এদেশের ছাত্র সমাজ সামরিক স্বৈরাচারের চাপিয়ে দেয়া শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাজপথে নামলো। তাদের উপর গুলি চালানো হলো। জয়নাল-দীপালীসহ কয়েকজনের প্রাণ কেড়ে নেয়া হলো। রক্তাক্ত হলো রাজপথ। এরপর থেকে সেই ১৪ ফেব্রুয়ারি এদেশে ঘটা করে পালন শুরু হলো ভালোবাসা দিবসের!

ভালোবাসা দিবসে ফুলের বাণিজ্য বেড়ে গেলো। বাঙালির অর্থনীতিতে নতুন সংযোজন ফুলের বাজার। কিন্তু সেই ফুল যত বেশি প্রেমিক-প্রেমিকার হাতে তার ছিটেফোঁটাও পড়ে না ১৪ ফেব্রয়ারি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের শহীদের স্মরণে! ভালোবাসা নিরন্তর এক জিনিস। সেটা নিষিদ্ধ হলে মানুষের জীবন থমকে যাবে। তবে মানুষের হৃদয়ের একান্ত সম্পদকে পণ্য বানিয়ে আনুষ্ঠানিকতার হাটবাজারে বিক্রি না করাই ভালো।

ভ্যালাইন্টাইন্স ডে -কে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস হিসেবে উদযাপন বিশ্বজুড়ে। কিন্তু ইতিহাস বলছে তার পেছনেও রয়েছে মৃত্যু। আছে প্রাণহানি। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দুটো ঘটনা জানা যায় ভ্যালান্টাইন ডে নিয়ে। সেন্ট ভ্যালান্টাইন ছিলেন এক রোমান পুরোহিত। যিনি রোমের সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের যুদ্ধ নীতির ঘোরতর বিরোধী। সম্রাট মনে করতেন বিবাহিত পুরুষদের চেয়ে অবিবাহিতরা যুদ্ধে অনেক বেশি দক্ষ। তাই যোদ্ধাদের বিবাহের বিরুদ্ধে ছিলেন। এর প্রতিবাদ করেছিলেন ভ্যালেন্টাইন। শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন সম্রাট। ১৪ ফ্রেরুয়ারি তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

আবার অন্য একটা তথ্যে বলা হয়েছে, ভ্যালেন্টাইন যখন জেলে বন্দী ছিলেন তখন একজন জেলকর্তার মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন তিনি। ভ্যালেন্টাইন তাকে জেল থেকেই প্রেমপত্র লিখেছিলেন। যার ওপর লেখা ছিল; ‘ ফ্রম ইউর ভ্যালান্টাইন’।

শেষ পর্যন্ত ১৪ ফেব্রুয়ারি তাকে হত্যা করা হয়। সেই থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে ভালোবাসা দিবস হিসেবে। যে তথ্যই সত্যি হোক, এই ভালোবাসা দিবসের পেছনে আছে হত্যা আর রক্তের ইতিহাস।

বাঙালির ভ্যালেন্টাইন দিবসের সাথে রক্তের ছাপ আছে। সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে সেদিন প্রাণ দিয়েছেন যারা তাদের স্মৃতিতে ক’টা ফুল পড়ে জানি না! তবে একুশ শতকে বাঙালি ভালোবাসা দিবসে তথ্য-প্রযুক্তির এই যান্ত্রিকতার মাঝেও অযান্ত্রিক হয়ে পড়ে তার ভালোবাসা প্রকাশে।

আসলে বাঙালির ভালোবাসা সব সময় বাঁধভাঙা স্রোতের মত। এই দেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন ভালোবাসা কী জিনিস! বিদেশী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে যিনি বলেছিলেন, তাঁর সবচেয়ে শক্তির দিক, তিনি তাঁর জনগণকে ভালোবাসেন। আর সবচেয়ে দুর্বল দিক হিসেবেও নিজে চিহ্নিত করেছিলেন তিনি তাঁর জনগণকে একটু বেশি ভালোবাসেন!

ভালোবাসায় অগাধ আস্থা ছিল বঙ্গবন্ধুর। যে কারণে অনেক প্রটোকলকে উপেক্ষা করে চলতে পেরেছেন তিনি। মানুষের ভালোবাসার মূল্য চুকাতে হয়েছে তাঁর জীবন দিয়ে। পাকিস্তান কারাগার থেকে নিজের স্বাধীন স্বদেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও ভাষণ দিতে গিয়ে মানুষের ভালোবাসার কথা বলতে ভোলেননি তিনি। বলেছেন; ‘ভাবতে পারিনি আপনাদের মাঝে ফিরে আসব। কিন্তু আপনাদের ভালোবাসাই আমাকে ফিরিয়ে এনেছে।’

যে দেশের মানুষ তার ভাষার জন্য রক্ত দেয়। যে দেশের মানুষ তার স্বাধীনতার জন্য রক্ত দেয়। যে দেশের স্থপতি তাঁর শক্তির জায়গা খুঁজে পায় মানুষের ভালোবাসায়। সে দেশের মানুষের ভালোবাসা আনুষ্ঠানিকতার মোড়কে পণ্য হয়ে কোন এক বিশেষ দিনে বিক্রি হতে পারে না। ভালোবাসা মানুষকে জয় করতে শেখায়। বাঙালি তার ভালোবাসা দিয়ে অনেক কিছুই জয় করেছে। বাঙালির ইতিহাস আসলে ভালোবাসার ইতিহাস।

 

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »