ভালোবাসা দিবস

বিএম আতিকুজ্জামান

অরল্যান্ডো শহরের ঠিক মাঝখানে ‘হেনরি ল্যু গার্ডে

বিশাল এক দীঘির পাড় ঘেঁষে এই নান্দনিক বাগান। ঢুকতেই চোখে পড়বে বিশাল বাগানবাড়ি।একজন হৃদয়বান ধনী সমাজসেবী তার সারা জীবনের শখের বাগান দান করে গিয়েছেন সবার জন্য।

সারা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে তিনি নিয়ে এসেছেন দুর্লভ সব গাছ-অর্কিড। সারাবছর জুড়ে এ বাগানে চলে নানা ধরনের সৃজনশীল কাজ। শিল্পকলা, জ্যাজ সঙ্গীত, আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র, কবিতার আসর, চিত্রকলা আর ভাস্কর্য্যের মেলা বসে এ বাগানের হর হামেশা।

ফেব্রুয়ারির প্রথম থেকে শুরু হয়েছে ভালোবাসা নিয়ে সব সৃজনশীলতা। চিত্রিত কবিতা, ভাস্কর্য, ছায়াছবি, জ্যাজ সংগীত আর কবিদের আসর।

বহুদিন ধরে কবিতার আসরে আসবার শখ আমার। আজ সময় হয়েছে। বিকেল চারটা থেকে শুরু। ‘অন্তরঙ্গ’ ( Intimate ) নামের একটি সংগঠন এ অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছে। এ সংগঠনটির সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ধারণা নেই। স্রেফ কবিতার জন্য আজ এসেছি এখানে। আমার সহধর্মিনী তার কাজ শেষ করে আসবে।

বিশাল আয়োজন। খানিকটা অবাক হয়ে দেখলাম প্রচুর কবিতাপ্রেমী এসেছে আজ। লাইন ধরে বাগানবাড়িতে ঢুকছে। মূল দরজার পাশে ছোট্ট করে লেখা : আজকের আয়োজন সব প্রেমিক প্রেমিকা আর ভবিষ্যতের জীবন সঙ্গী বেছে নেবার জন্য। কবিতার ছন্দে খুঁজে নিন জীবনসঙ্গী।

সেটি দেখে উৎকণ্ঠিত হলাম। আজকের আয়োজনটাতো খানিকটা ‘ব্লাইন্ড ডেটিংয়ের’ মতন। না বুঝে, না জেনে চলে এসেছি। ফিরেও যেতে পারছি না। পিছনের দিকের একটি চেয়ারে বসলাম। ততক্ষণে কবিতা পাঠ শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রেমের বাঁধভাঙা কবিতা, ডেভিডের কবিতা, ভেনাসের কবিতা। অল্পবয়সী একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা একসাথে একটি গভীর প্রেমের কবিতা পড়তে পড়তে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিয়ে দিল। করতালিতে ভরে উঠল চারপাশ। অনেকেই বলে উঠল : আরেক দফা হয়ে যাক।

আমি অস্থির হয়ে আমার সহধর্মিনীর জন্য অপেক্ষা করছি। এরই মধ্যে এক নারী পাশে এসে বসলেন। মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন। তার নাম মার্থা। তিনি কবিতাপ্রেমী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিলেন। আমিও তাই দিলাম। তিনি বললেন তার জন্ম চিলিতে। আমি মাথা নেড়ে বললাম আমি পাবলো নেরুদার ভক্ত। তিনি আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ জেনেই বললেন রবিঠাকুরের কথা। আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। আবার মনোনিবেশ করলাম কবিতাতে।

অদ্ভুত ব্যাপার। এখানে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ এসেছে। নানা ভাষার বিখ্যাত কবিদের কবিতা তারা পড়ছে। পড়া শেষ হতেই অজানা অচেনা একজন তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। তাকে তার পাশে বসার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। আমার পাশের নারীটি অনেক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব কবিতা ব্যাবচ্ছেদ করছেন। আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে অধীর আগ্রহে আমার সহধর্মিনীকে খুঁজছি। তিনি সেটি টের পেয়ে বললেন : আপনার প্রেমিকাকে খুঁজছেন? আমি মাথা নাড়তেই হেসে দিয়ে কবিতাতে মনোযোগ দিলেন।

আমার সহধর্মিনী ততক্ষণে চলে এসেছেন। সে মুচকি হেসে আমাকে খানিকটা তিরস্কার করল, আবার খুশিও হলো এ ধরনের একটি ব্যাতিক্রমী অনুষ্ঠানে নিয়ে আসার জন্য। ‘ঝড়ে বক মরেছে’ ভেবে একগাল হাসলাম। খানিক পরই আমাদের নাম ডাকা হলো।

আমি মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে আমার প্রেমিকা আমার সহধর্মিনীকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। এরপর রবিঠাকুরের একটি কবিতা পাঠ করলাম।

“ When I kiss your face to make you smile,
my darling, I surely understand what the pleasure is
that streams from the sky in morning light,
and what delight that is which the
summer breeze bring to my body—
when I kiss you to make you smile.”

একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা আমাকে আবার কবিতাটি পাঠ করতে বললো। আমি আবার পড়লাম। মনের আবেগ মিশিয়ে পড়লাম। আমার সহধর্মিনী আমার পাশে এসে দাঁড়ালো।

আমাদের ভালোবাসার দিনটি রাঙা হয়ে গেল দিনের শেষ সূর্যালোকে।

সবাইকে ভালোবাসা দিবসের শুভেচ্ছা।