ভালোবাসার পাগলামি ও জেনিফারের গল্প

ভালোবাসার

রেসিডেন্সি শেষ করে তখন প্রথম কাজে যোগদান করেছি। ল্যাব টেস্ট করার জন্য দিন-রাত কাজ করে যায় ফ্লেবোটোমিস্টরা। জেনিফার তাদেরই একজন। দেখা হয়েছে কয়েক দিন। মনে হয়েছে কী যেন বলতে চায় আমাকে। তাকালে মিষ্টি হেসে চলে যায়। একদিন পাশে বসে রইল ১০ মিনিট। বললাম, কিছু বলবে? জেনিফার এক নিশ্বাসে বলে ফেলল, তোমাকে কি শ্যাডো করতে পারব? জানো কতজনকে বলেছি, কেউ রাজি না। মাত্র রেসিডেন্সি শেষ করেছি, কত ছাত্র পড়িয়েছি, বললাম অবশ্যই। বসের কাছে গিয়ে অনুমতি নিলাম। প্রতি দুই সপ্তাহে আমার ২৪ ঘণ্টা ডিউটি থাকে। রাত ১০টার পর জেন শ্যাডো করবে আমাকে।

খুব ব্যস্ত থাকতে হয় রাতে। ওর সঙ্গে কথা হয় কম। ছয় মাসে জানলাম ওর একটা মেয়ে আছে। ছয় বছর বয়স। ডাক্তার সে। চীন থেকে পাস করেছে। এ দেশে এসে তখন পর্যন্ত পড়া শুরু করতে পারেনি ইউএসএমএলইর জন্য। ডিভোর্স হয়েছে পাঁচ বছর। এখন চাকরি করে পয়সা হয়েছে। ডাক্তারি করার কথা চিন্তা করছে। তাই শ্যাডো করা শুরু করেছে। পরীক্ষা দিয়ে রেসিডেন্সি পাওয়া সোনার হরিণের মতো। সময় যত বেশি পার হয়, রেসিডেন্সির চান্স তত কমে যায়। তাই সব রকম চেষ্টা করছে।

জেনিফারের শ্যাডো করার কথা ছয় ঘণ্টা। রাত ১০টা থেকে ভোর ৪টা। কোনো দিনও এক মিনিট দেরি করে আসেনি। আর ৪টার এক মিনিটও আগে চলে যায়নি। শেখার অনেক আগ্রহ। কোনো একটা হলিডে ছিল সেদিন। তখন রাত, কম ব্যস্ত। জেন বলা শুরু করল ওর আমেরিকার স্বপ্ন আর এর পেছনে চেষ্টা করার কাহিনি। বিয়ে হয়েছিল এক চায়নিজ ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে। বনিবনা হয়নি। একদিন বের হয়ে যেতে হয়েছিল এক কাপড়ে এক বছরের বাচ্চা নিয়ে। বান্ধবীর বাসার বেসমেন্টে থেকে, বাচ্চাকে বেবিসিট করে কীভাবে ফ্লেবোটোমিস্ট হয়েছিল, বলল সেই কাহিনি। ওর মা এসে বাচ্চা রাখা শুরু করেছে বলে এখন শ্যাডো করতে পারছে। চোখের পানি মুছে রোগী দেখতে চলে গিয়েছিলাম সেদিন।

লেখিকাছয় মাস চলে গেল। ওর ডেডিকেশনের কমতি নেই। এর মাঝে জেনিফার ম্যাটের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে ওর এক বান্ধবীর মাধ্যমে। ম্যাট হাসপাতালের সামনে রাত চারটা পর্যন্ত বসে থাকত জেন, কাজ শেষ না করে গাড়িতে বসা পর্যন্ত। একদিন ডিনার আনেনি বলে রাত ১২টায় ডিনার নিয়ে হাজির ম্যাট জেনের জন্য। জেন একদিন আমাকে বলল, না খেয়ে থেকে, প্রতিদিন অপমানিত হয়ে এবং আগের বিয়েতে এত কষ্ট পেয়েছে যে, নতুন কাউকে ভালোবাসার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

পরের সপ্তাহে জেন গত আট মাসে প্রথমবারের মতো শ্যাডো করতে এল না। পরদিন টেক্সট করে জানাল, সে অসুস্থ, কাজে আসবে না কদিন। তারপর একদিন সকালবেলায় টেক্সট পেলাম ওর। ‘হাসপাতালের ১১২ নম্বর কেবিনে আছি, তুমি কি একটু দেখতে আসবে?’ সেদিন রোগী দেখা শেষ করে বিকেলে গেলাম। বিছানার পাশে যথারীতি ম্যাট বসা। কিন্তু আজকে জেনের চোখে ভালোবাসার আলো আর ম্যাটের চোখে পানি। লক্ষ করলাম জেনের ডান পা প্লাস্টার করা। শুনলাম ওরা হাইকিংয়ে গিয়েছিল গত সপ্তাহে। জেন পথ হারিয়ে নার্ভাস হয়ে গিয়েছিল। অসাবধানতায় গর্তে পা ফেলে পা ভেঙে ফেলেছিল। ওর বান্ধবীরা সাহায্য আর পানির জন্য ছোটাছুটি করছিল। ফোনের সিগনাল খুব দুর্বল ছিল। জেন শুধু ম্যাটকে টেক্সট করেছিল। তারপর আইফোন ফাইন্ডারের মাধ্যমে জেনকে খুঁজে বের করে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে নিয়ে আসা, সার্জারি করার দিন থেকে রাতদিন বসে থাকা…ম্যাট বুঝিয়ে দিয়েছে ভালোবাসা আছে, থাকবে। জেন বলল, ও খুব ভালো আছে। আমি জানি, ও খুব ভালো থাকবে।

কয়েক বছর পর ভ্যালেনটাইনস ডেতে ওরা বিয়ে করেছে। একটা ছেলে হয়েছে আর ওর মেয়ে নাকি মহাখুশি ছোট ভাই পেয়ে। জেন মুভ করেছে অন্য স্টেটে। রিকমন্ডেশান লেটার দিলাম যখন, ফিজিশিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে চাকরিতে জয়েন করল সে। এখন আবার রিকমেন্ডেশান লেটার চাইছে রেসিডেন্সির জন্য আবেদন করবে। আর হ্যাঁ, প্রতি ভালোবাসা দিবসে আমার অফিসে জেনের কাছ থেকে ফুল আসবেই। আমি নাকি ওর জীবনে সাফল্যের আলো জ্বেলেছি।

ভালোবাসার কত রং দেখি প্রতিদিন। কফি কার্টের মেয়েটা একটা কুকি ফ্রি দেবেই দেবে। হাসপাতালের ট্রান্সপোর্টার আইডি কার্ডের কাভার ফিলিপাইন থেকে নিয়ে এসে দেবে। চায়নিজ নিউ ইয়ার, ক্রিসমাস, ভ্যালেনটাইনস ডেতে সহকর্মী ডাক্তার বন্ধুদের কাছ থেকে সবচেয়ে বড় গিফট আমিই পাব। কারণ আমার বাচ্চা আছে। রোগীদের ভালোবাসার পাগলামি তো সীমাহীন। হাসপাতালের নিয়ম তাই ২৫ ডলারের বেশি কিছু দিয়ে কেউ গিফট দিতে পারবে না। সবার মনে ফাগুন আর ভালোবাসার রং লাগুক প্রতিদিন।