বার্তাবাংলা ডেস্ক »

Dating App

বর্তমানে ভাষার মাস চলছে। জাতি এখন আবেগ-উচ্ছ্বাসে প্রাণবন্ত অবস্থায় রয়েছে। নতুন বই প্রকাশ, বইমেলা আর নানা অনুষ্ঠানে পুরো মাসটাই কাটবে উত্সবমুখরতায়। এ সময়ে কেবল নবীন প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে নয়, অনেক প্রবীণ জনের মধ্যেও জাতীয় ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অর্জন এবং গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের জাগরণী কর্মকাণ্ড এবং এসবের ভাবসম্পদ সম্পর্কে উদাসীনতা তৈরি হয়েছে। তাই প্রসঙ্গত কয়েকটি কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন শুধু ছাত্র-তরুণদের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এতে রাজনীতিবিদদের সংশ্লিষ্টতাও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কিন্তু এই আন্দোলনের তাত্ত্বিক, যৌক্তিক ও ভাবগত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সাধকবৃন্দ। আমরা দেখব এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন বহু ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। কিছু কম যাননি তাঁরও চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ সাহিত্যসাধক মুনশি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। এই সঙ্গে স্মরণ করা দরকার, গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যে জাগরণ ঘটেছিল, তার পেছনে আরও বড় পরিসরে ভূমিকা পালন করেছেন দেশের প্রগতিশীল চেতনার লেখক-শিল্পী ও শিক্ষাবিদসহ নাগরিক সমাজ।

১৯৫০ দশকের গোড়ায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের আগে ১৯৫১ সালের ১৬-১৯ মার্চ চট্টগ্রামে আয়োজিত হয় এই বঙ্গের প্রথম সংস্কৃতি সম্মেলন। এর মূল সভাপতির ভাষণে বর্ষীয়ান গবেষক ও পুঁথি সংগ্রাহক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ জাতীয় সংস্কৃতির পথনির্দেশ দিয়েছিলেন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায়। ভাষা আন্দোলনের পরে কুমিল্লায় ১৯৫২ সালের ২২, ২৩ ও ২৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলনেও সভাপতির ভাষণে এই গ্রামীণ ধর্মপ্রাণ মুসলিম পণ্ডিত তাঁর বক্তব্য ও অবস্থানে দৃঢ় ছিলেন। এরপর ১৯৫৪ সালে ঢাকার কার্জন হলে অনুষ্ঠিত হয় তিন দিনের পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন। এতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অত্যন্ত শক্ত ভাষায় দারুণ সাহসিকতার সঙ্গে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অখণ্ডতা এবং হিন্দু-মুসলিমের মিলিত সাধনার কথা তুলে ধরেন।

আদতে এই তিনটি সম্মেলনের প্রস্তাব, আহ্বান ও ভাষণের মাধ্যমে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী জাগরণের ও পথচলার নির্দেশনা পাওয়া গিয়েছিল। এই তিন সম্মেলনের বক্তব্যেই জাতির জন্য উন্নত ও মহৎ ভাবনার পথ রচনা করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম সম্মেলনে কবি সুফিয়া কামাল বলেছিলেন, ‘জীবনকে যে ভালোবাসতে পারে, মানুষকে যে ভালোবাসে, একমাত্র সে–ই ফুল ফোটাতে পারে, যে ফুলের পারিভাষিক নাম হচ্ছে সাহিত্য, শিল্প, সংগীত ও বহুধা সংস্কৃতি।’ আর মূল সভাপতি অশীতিপর আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বলেছিলেন, ‘ঐতিহ্য সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি ধ্রুব নক্ষত্রবিশেষ। ঐতিহ্যের অনুসরণ ও সেই স্রোতোধারাকে চির বহমান করিয়া তোলাই সংস্কৃতিসেবীর আসল কাজ।’

কুমিল্লা সম্মেলনের আবেদনে জাতির মানস-সংস্কৃতি উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে বলা হয়েছিল, ‘চিন্তা-নায়ক, কবি, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের সমবেত প্রচেষ্টাই এই কার্যকে দ্রুত সাফল্যের পথে লইয়া যাইতে পারে।’ ১৯৫৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বাঙালির সাহিত্য সংস্কৃতির ধর্ম–বর্ণ-অঞ্চলনির্বিশেষে অখণ্ড ঐতিহ্যের ওপর জোর দিয়েছিলেন। আর মাওলানা ভাসানী ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলন থেকে বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধিতাকারী পাকিস্তানিদের বিদায় সম্ভাষণ জানিয়েছিলেন।

নানা উপলক্ষে উচ্ছ্বাসে-আবেগে ভাসতে ভাসতেও আমাদের মনে রাখা দরকার, কেবলমাত্র রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লড়াই বা সংগ্রাম থেকে একটি জাতির জাগরণ ঘটে না। সবচেয়ে বড় কথা, এভাবে কোনো জাতির পক্ষে মহত্ত্ব অর্জন সম্ভব হয় না। কেবল আন্দোলন, আপসহীন সংগ্রাম ও ত্যাগেও এটি অর্জিত হয় না। এর সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত হতে হয় স্বপ্ন ও আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠার সাধনা। রাজনৈতিক আন্দোলনে সেদিন শিল্পী-সাহিত্যিক ও মনীষীরা জাতীয় জাগরণের এই ভাবসম্পদের জোগান দিয়েছিলেন। এ ধারা ১৯৫৭ সালের পরেও থামেনি, এমনকি আইয়ুব খানের সামরিক শাসনও তাকে দমাতে পারেনি। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সামরিক স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সারা দেশে আয়োজিত হয়েছিল বিশাল সব উৎসব। ঢাকায় ১০ দিন ও ৭ দিনের দুটি আয়োজন, চট্টগ্রামে ৭ দিনের কেন্দ্রীয় আয়োজন এবং অন্যান্য জেলা শহরেও এক বা একাধিক দিনের অনুষ্ঠান হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানের সেমিনারে, স্মরণিকায়, পত্রিকার ক্রোড়পত্রে এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কেবল রবীন্দ্র-বন্দনা হয়নি, সমকালীন প্রেক্ষাপটে বাঙালির মুক্তি ও প্রগতির পথে রবীন্দ্রনাথের অবদান নিয়ে যেমন আলোচনা হয়েছে, তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণ ও জাতিগত বিকাশের কথাও এসেছে। আর সেই থেকে ১৯৬০ দশকজুড়ে জেলায় জেলায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে, কলেজে, বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে রবীন্দ্রজয়ন্তী, রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী, এমনকি রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তজয়ন্তী আয়োজিত হয়েছে। শুধু কি তা–ই, সুদূর আফ্রিকার কঙ্গোর নিহত জাতীয়তাবাদী নেতা প্যাট্রিস লুমুম্বার স্মরণে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে কবিতা, অনেক বিশ্লেষণধর্মী লেখা। বিশাল আকারে উদ্‌যাপিত হয়েছে সোভিয়েত বিপ্লবের সুবর্ণজয়ন্তী (১৯৬৭), সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার জনক মাক্সিম গোর্কির জন্মশতবর্ষ (১৯৬৮), রুশ বিপ্লবের নায়ক লেনিনের জন্মশতবর্ষ (১৯৭০)। মানুষ স্মরণ করেছে চীনের অভ্যুদয়কে, সংহতি জানিয়েছে ভিয়েতনামের সংগ্রামী মানুষের সঙ্গে। মননে-মানসে যুক্ত হয়েছে আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকার মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে। এসব কেবল কোনো বিদেশি উপলক্ষের উদ্‌যাপন ছিল না। এ ছিল বস্তুত আত্মবিকাশ ও মহৎ ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক উদ্দীপনাপূর্ণ মানসযাত্রা। তখন সংগ্রামী বাঙালি আপন ক্ষুদ্র গণ্ডি ছেড়ে বিশ্বের অধিবাসী হয়ে উঠেছিল। সব নগণ্য ও সংকীর্ণ চিন্তা ঝেড়ে ফেলে নিজের জন্য মহৎ অভিযাত্রার বিশাল বর্ণিল প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।

এই মহৎ উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতাতেই সেদিন এই বাংলার মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিল, একটি অসাম্প্রদায়িক মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ কায়েমে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের সেই স্বপ্ন, সেই ঐক্যকে সার্থকতা দেওয়ার কাজে রাজনৈতিক লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর স্থান তাই ইতিহাসে অক্ষয়–অমর হয়ে থাকবে।

সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, মহৎ জাতি হয়ে ওঠার পেছনে বহু মনীষীর, বহু শিল্পীর, বহু সাধকের অবদান ছিল। সেই মহত্ত্বের উত্তরাধিকার যেন আমরা বিস্মৃত না হই। কেননা, তা হারালে জাতি তার মহৎ অভিযাত্রায় খেই হারাবে, আর তাতে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণ ব্যাহত হবে। উন্নয়নের ছক-মিলানো সব অবকাঠামো আর ব্যক্তি মানুষের জাঁকজমক জাতির ভেতরের দৈন্য ঢাকতে পারবে না। রবীন্দ্রনাথের অমর কবিতার সেই ছত্রটি মনে করা জরুরি, ‘স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখ/ বৃহৎ জগৎ হতে, সে কখনো শেখে নি বাঁচিতে। (এবার ফিরাও মোরে)।’

এভাবে অনেক প্রাচুর্য ও প্রচুর বৈভব আর বিপুল ক্ষমতার মধ্যেও সত্যিকারের বাঁচতে শেখা হবে না, যদি বৃহৎ জগতের মহৎ পথের যোগ ছিন্ন হয়ে যায়।

আজ নানা ক্ষুদ্র স্বার্থ, ক্ষুদ্র চিন্তার আগ্রাসনের সময় আমাদের ইতিহাসের এই মহৎ অবদান ও অর্জনের কথা মনে করা দরকার।

আবুল মোমেন কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

Dating App
শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »