বার্তাবাংলা ডেস্ক »

Dating App

উনত্রিশ বছর পর ডাকসুর নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। সেই ঘোষণা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছায় নয়। আদালতের নির্দেশে। নির্বাচনের এই ঘোষণা- দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা দরোজা খুলে যাওয়ার মত। সেখান দিয়ে বসন্তের বাতাস ঢুকে পড়ার কথা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নির্বাচনী বাতাস বইতে শুরু করেছে। তবে সেটা বসন্তের বাতাস নাকি বৈশাখের দমকা হাওয়া নাকি হিম আশ্রিত শৈত্যপ্রবাহ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না! কিন্তু তারপরও প্রায় তিন দশক পর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ‘নির্বাচন’ শব্দটা উচ্চারিত হচ্ছে এটাই বা কম কী!

সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে নিজেদের আদর্শ আশ্রিত ছাত্র সংগঠনের কোন সদস্যও পার পাবে না সেই মনোভাব আর সদিচ্ছা সরকারের থাকতে হবে। ডাকসু নির্বাচনের মধ্যে দিয়েই সরকারের সেই মনোভাব আরো দৃশ্যমান হবে; সেটা আশা করতে দোষ কোথায়?
ডাকসু নির্বাচন দূরে থাক, ডাকসু কী, এই প্রশ্নের উত্তর-ই ভুলে গিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। শুধু অভিভাবকদের মনে রাখতে হয়েছে। কারণ, ডাকসুর ফি দিতে হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলে-মেয়ে পড়াতে। শুধু ডাকসু নয়। চাকসু, জাকসু, ইকসু সব জায়গায় একই অবস্থা।

ডাকসুর নির্বাচন হয়নি। ডাকসু ভবন তালাবন্ধ। ডাকসুর কার্যক্রমও বন্ধ। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের ফি দিতে হয়েছে। তিন দশকে সেই টাকার অংকটা অনেক বড় হওয়ার কথা। গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে জানার খুব কৌতূহল থেকে যাচ্ছে, সেই অংকটা কত?

এই দেশে নীতি-নৈতিকতা নিয়ে অনেক কথার চর্চা হয়। কিন্তু ডাকসুর নির্বাচন নেই। কার্যক্রম নেই। অথচ ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে ফি নেয়া হচ্ছে! এটা কতোটা নৈতিক? এই প্রশ্নটা কী কখনো জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়েছে? উত্তরটা ‘হ্যাঁ’ বলা যাচ্ছে না। উত্তর যখন‘ না’ তখন নীতি-আদর্শ-জ্ঞান- প্রজ্ঞায় যারা এগিয়ে থাকা সমাজ, তাদের কণ্ঠস্বর এতো নিচু থাকলো কেন?

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে যারা মাঝে-মধ্যে একটু সরব হয়েছেন তাদের বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ। সাবেক ছাত্রনেতা। কিন্তু বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনীতির ডামাডোলের মাঝে তাদের সেই কণ্ঠস্বর ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে গেছে। আবার তাদের বক্তব্যও খানিকটা নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে। যা গোটা ছাত্র সমাজকে আন্দোলিত করেনি। আড়োলিত করেনি।

বেশিরভাগ সাবেক ছাত্রনেতা বলেন; দীর্ঘদিন ডাকসুর নির্বাচন বন্ধ থাকায়, ভাল রাজনীতিবিদ তৈরি হচ্ছে না। যে কারণে, সংসদে ভাল রাজনীতিবিদের সংখ্যা কমে গেছে। সংসদ সদস্যদের বেশিরভাগ ব্যবসায়ী। এরকম অনেক বক্তব্য তাদের। সেগুলো অসত্য নয়। বরং সেটাই বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতা একদিনে তৈরি হয়নি। কিন্তু তাদের এই বক্তব্যের মতান্তর থাকা খুব স্বাভাবিক।

ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত হলে কী শুধুই ভাল নামী-দামী রাজনীতিবিদ তৈরি হতেন? আমরা খুব ভাল সংসদ সদস্য পেতাম! ডাকসুর ভিপি, জিএস অনেকে ছিলেন। যারা এখন জাতীয় সংসদেরও সদস্য। কিন্তু তাঁরা কী ছাত্র রাজনীতির সময় যে আদর্শ, নীতির কথা বলতেন জাতীয় রাজনীতিতে জায়গা পেয়ে সেই আদর্শে অটুট থাকতে পেরেছেন?

অথবা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কী তাদের সেই নীতি-আদর্শে অটুট থাকতে দিয়েছে। বা দিচ্ছে? দ্বিতীয় আরো একটা প্রশ্ন থাকছে। ডাকসু নির্বাচনসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন মানে কি শুধু জাতীয় পর্যায়ে কিছু নির্বাচন তৈরি হওয়ার সুযোগ?

ইতিহাস অন্য কথা বলছে। আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নেতৃত্বে যারা এসেছেন তারা ছাত্র-ছাত্রী হিসেবে মেধাবী ছিলেন। তাদের সেই মেধার প্রয়োগ শুধু তারা রাজনীতিতে করেছেন তা নয়। সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে কাজে লাগিয়েছেন। তাতে তারা ব্যর্থ তা নয়।

ডাকসুকে একটা সময় ‘মিনি পার্লামেন্ট’ বলা হতো। এটা ঠিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এক সময় প্র্যাচের অক্সফোর্ডও বলা হতো। কিন্তু সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ বেড়েছে। ছাত্র-ছাত্রী বেড়েছে। শিক্ষক বেড়েছে। কিন্তু পৃথিবীর নামী-দামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপরের দিকে জায়গা করে নিয়েছে, নাকি নিন্মগামীতাই তার বহমানতা!

ডাকসু রাজনীতিবিদ তৈরির ফ্যাক্টরি! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের মুখেও কথাটা শুনছি! টেলিভিশন টক শো-তে অনেক শিক্ষক-ই ডাকসু নির্বাচন ঘোষণার পর এরকম সুরে কথা বলছেন। কথাটা অসত্য হয়তো নয়। তবে স্থূল! ঐ বাক্যের মধ্যে পরোক্ষভাবে প্রকাশ ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন একটা ফ্যাক্টরিতে পরিণত হয়েছে। যেখানে অনেক পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। যার অনেকগুলোর গুণগতমান নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। অনেকগুলো মেয়াদ উত্তীর্ণ যা কি না ঠিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেই যায় না।

বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান আহরণ আর বিতরণের জায়গা। যেখানে অবাধে এই আহরণ আর বিতরণ প্রক্রিয়া চলবে। সেটা মুক্তমনে। ডাকসু সখোনে সংস্কৃতি-ক্রীড়া চর্চার আর একটা বড় মঞ্চ তৈরি করে দেয় সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের।

ডাকসু প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় তিন দশক পার করায় রাজনীতির চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক বিকাশের অনেকগুলো জায়গা। আদালতের নির্দেশ মেনে ডাকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়েছে। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মনে ডাকসু নিয়ে আগ্রহ-উৎসাহ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বহুমুখি শঙ্কার বাতাবরণও তৈরি হয়েছে।

নির্বাচন হবে তো? হলেও সেটা সন্ত্রাস আশ্রয়ী নির্বাচন হবে না তো? বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে; কোন ধর্মাশ্রয়ী ছাত্র সংগঠন নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। সেটা শুধু উন্নয়নশীল বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য নয়, প্রগতিশীল সমাজ গঠনের জন্যও একটা ভাল উদ্যোগ। ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত জমিন পেয়ে যায়, তাহলে সেটা সমাজের অনেক গভীরেই শেকড় গাঁথবে।

এটা স্বাভাবিক। যা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। একইভাবে সন্ত্রাসাশ্রিত রাজনীতির উর্বর ভূমি যেন না হয়ে ওঠে কোন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ বা অন্য কোন শিক্ষাঙ্গন। সে ব্যাপারে সরকারকেও কঠোর হতে হবে।

সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে নিজেদের আদর্শ আশ্রিত ছাত্র সংগঠনের কোন সদস্যও পার পাবে না সেই মনোভাব আর সদিচ্ছা সরকারের থাকতে হবে। ডাকসু নির্বাচনের মধ্যে দিয়েই সরকারের সেই মনোভাব আরো দৃশ্যমান হবে; সেটা আশা করতে দোষ কোথায়?

 

Dating App
শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »