আপনি বলেন, তারা শুনেন, সাধারণ মানুষ দিন গোনেন

উজ্জ্বল

চিকিৎসক ও নার্সসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, রোগীদের প্রতি আন্তরিক ও সহমর্মী হয়ে চিকিৎসা প্রদান এবং চাকরি না করলে ওএসডি করার ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার বার বলে যাচ্ছেন, চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই শুনে যান আর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার বাস্তবায়ন দেখতে সাধারণ মানুষ দিন গুণে যান।

গত এক দশক ধরে বলা, শোনা ও দিন গোনার রীতি চলে আসছে! গত এক দশকে দুই দফা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ও সর্বশেষ তৃতীয় বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর গত ২৭ জানুয়ারি সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, স্বাস্থ্যসচিবদ্বয়, চিকিৎসক নেতা ও স্বাস্থ্য সেক্টরের নীতিনির্ধারকদের সেই একই নির্দেশনা দিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার গুরুত্ব অনুধাবন করে বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও অনলাইনগুলো গুরুত্বসহকারে প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার করলো। কিন্তু অবস্থা কী আদৌ বদলাবে?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা চালু করার নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু আপনি কি জানেন ডিজিটালাইজড পদ্ধতিতে হাজিরা কয়েক বছর আগে সারাদেশেই চালু হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বৈঠকে এ পদ্ধতিতে হাজিরা মোটেই সন্তোষজনক নয় বলেও প্রতিবেদন দাখিলের রেকর্ড নথিভুক্ত রয়েছে। প্রয়োজনীয় মনিটরিং ও সুপারভিশনের অভাবে কেউ কেউ মেশিনে পাঞ্চ করেই ব্যক্তিগত কাজে দিনভর ব্যস্ত থাকেন, দুপুরের পর আবার পাঞ্চ করে বেরিয়ে যান।

সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক ও ল্যাবরেটরি সুবিধা নেই তবুও অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা শতের ঘর ছাড়িয়ে গেছে। এর লাগাম টেনে না ধরলে হাতে কলমে শিক্ষা না পেয়ে ভবিষ্যতে ভাল মানের ডাক্তার তৈরি হবে না
কেউ কেউ ডিজিটাল মেশিনে নিয়মিত হাজিরা দেয়ার বিষয়টি ‘অসহ্য’ লাগে বিধায় মেশিন নষ্ট করে রাখেন। তবে চিকিৎসক কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকেই ভালো মনের রয়েছেন বলে এখনও সাধারণ মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছেন। ওইসব ভালো মানুষের কারণেই সীমিত ব্যয়ে এমনকি বিনামূল্যে তৃণমূলের মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছে। ডিজিটাল মেশিনে হাজিরা নিশ্চিত করতে হলে দলীয় চিকিৎসক নেতাদের খবরদারি বন্ধ করতে হবে। একটি হাসপাতালের প্রধান যখন চিকিৎসক নেতাদের হম্বিতম্বির কারণে ইচ্ছা থাকলেও কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না তখনই ডিজিটাল হাজিরা নামেই থাকে!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসকরা জেলা ও উপজেলায় না যেতে চাইলে তাদের ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) করতে বলেছেন। এটি করলে চিকিৎসক ও নার্সরা বেজার হবেন না বরং খুশি হবেন। ওএসডি হলে আর কাজ করার ঝামেলা থাকবে না। ইচ্ছামতো ঘুরেফিরে মাস শেষে বেতন-ভাতা সবই পাবেন।

দায়িত্ব পালন না করতে পারলে চাকরি ছেড়ে দিতে বলেছেন। কিন্তু সরকারি চাকরি তারা ছাড়বেন না, আপনি ছাড়াবেন, আদালতে রিট ঠুকে দিয়ে বহাল তবিয়তে থাকবেন। সুতরাং কীভাবে সত্যিকার অর্থেই ওই শ্রেণির চিকিৎসক নার্সদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় তা চিন্তাভাবনা করতে পারেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা গভীর রাত অবধি চেম্বারে রোগী দেখলে পরদিন সকালে এসে সরকারি হাসপাতালে কীভাবে চিকিৎসা দেবেন এ কথাটি শতভাগ সত্যি বলেছেন। রাজধানী ঢাকাসহ সর্বত্রই একই অবস্থা বিরাজ করছে। টাকার পেছনে হরদম ছুটছেন সবাই। সরকারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বিএসএমএমইউ’র মতো বৈকালিক অধিবেশনে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করলে সাধারণ রোগীরা খুশি হবে।

সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক ও ল্যাবরেটরি সুবিধা নেই; তবুও অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা শতের ঘর ছাড়িয়ে গেছে। এর লাগাম টেনে না ধরলে হাতেকলমে শিক্ষা না পেয়ে ভবিষ্যতে ভালো মানের ডাক্তার তৈরি হবে না।

নার্সদের আপনি দ্বিতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা বানিয়েছেন, গত এক দশকে হাজার হাজার নার্সের চাকরি হয়েছে। কিন্তু নার্সদের মধ্যে দলাদলি, ক্ষমতাসীনদের দলের ব্যানারে একেক নেতার একেক সংগঠন। ফলে নার্সদের কাছ থেকে অনেকেই কাঙ্খিত সেবা পান না। তবে এখনও বেশিরভাগ ডাক্তার ও নার্স আন্তরিক বলেই দেশের চিকিৎসা সেবা এগিয়ে চলছে। তবে মনিটরিং ও সুপারভিশন বৃদ্ধি করলে চিকিৎসা সেবার মান আরও অনেক অনেক বাড়বে।

তা না হলে বাতকা বাত হিসেবেই নির্দেশনা রয়ে যাবে। আপনি বলবেন, ডাক্তার নার্সরা শুনবেন আর সাধারণ মানুষ শুধু আশায় দিন গণনা করবেন।