স্বর্ণ খাতে সোনার দিন আসবে

সোনা

প্রথম আলো ফাইল ছবিশেষ পর্যন্ত স্বর্ণনীতিমালা দৃশ্যমান হয়েছে। সম্প্রতি নীতিমালাটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। স্বর্ণ নীতিমালার খসড়া প্রস্তুতের প্রক্রিয়ায় লেখকের সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ হয়েছিল। স্বর্ণ ব্যবসায়ী, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ও মন্ত্রণালয় এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করে ও তাঁদের মতামত নিয়ে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়েছিল। নীতিমালা জারি হওয়ায় ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি পূরণ হতে যাচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে স্বর্ণালংকার আমাদের দেশে ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা হলেও সুষ্ঠু নীতিমালার অভাবে এই খাতে দীর্ঘদিন ধরে আইনানুগ চর্চার অভাব অনুভূত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা অনেক দিন থেকেই নীতিমালার কথা বলে আসছেন। তবে তাঁদের দাবিটি জোরালোভাবে উঠে আসে শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃক একটি বড় জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে অভিযানের পর। ঘটনাটি ২০১৬ সালে বনানীতে একটি আবাসিক হোটেলে ধর্ষণকে কেন্দ্র করে। ধর্ষণকারী হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অভিযানটি পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায়, বড় একটা জুয়েলারিতে প্রায় ১৫ মণ স্বর্ণালংকার পাওয়া গেলেও তার পক্ষে বৈধ আমদানির কাগজপত্র নেই। সংগত কারণে, চোরাচালানের দায়ে পরবর্তী তদন্ত ও বিচারের নিমিত্তে এসব স্বর্ণ কাস্টমস ও অন্যান্য আইন অনুযায়ী জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা করা হয়।

ঘটনাটি দেশের পুরো স্বর্ণ ব্যবসাকে বৈধতার সংকটে ফেলে দেয়। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও কি তাহলে একই অবস্থা বিরাজ করছে? দেশে স্বর্ণের প্রায় ১০ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব ব্যবসার সঙ্গে প্রায় ২০ লাখ লোক জড়িত। হাজার কোটি টাকার ব্যবসা চলছে, অথচ সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই।

তবে স্বর্ণের ক্ষেত্রে এত দিন একেবারেই কোনো নীতিমালা ছিল না—অনেকের এ ধরনের মন্তব্য সর্বতোভাবে সঠিকও নয়। আগেও এ-সংক্রান্ত নানা বিধিবিধান ছিল। কাস্টমস অ্যাক্ট, ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন, আমদানি ও রপ্তানি নীতিমালা, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টসহ অন্য সংশ্লিষ্ট আইনে আরও পণ্যের মতো স্বর্ণ আমদানি ও রপ্তানি এবং ব্যবসার প্রসার ও নিয়ন্ত্রণের বিধান বিদ্যমান আছে। যেমন বর্তমানের আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী স্বর্ণ নিয়ন্ত্রিত আমদানি পণ্য। ওই আদেশের সেকশন ২৬(২২) অনুসারে যে কেউ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে যেকোনো পরিমাণে স্বর্ণ আমদানি করতে পারবেন। এখানে স্বর্ণ আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের আগাম অনুমতির প্রয়োজন হবে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রকৃত সত্য হলো, স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে এই অনুমতির জন্য তেমন কেউ আবেদন করেননি।

যত দূর জানা যায়, দু-একজন আবেদন করলেও তাতে অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়ার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই অনুমোদন দেয়নি। এর অর্থ হলো, এলসি খুলে বৈধ পথে আমদানির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেউ উৎসাহিত হননি। যথাযথভাবে আইন প্রয়োগ না করার ফলেও হয়তো কেউ তাড়না অনুভব করেননি। তাই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিধান হালনাগাদ এবং যুগোপযোগী করে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের দাবিটি সামনে চলে আসে।

আগে বর্ণিত বড় জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে অভিযানের ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চোখ খুলে দিয়েছে। বিমানবন্দরসহ অন্যান্য স্থানে মণকে মণ স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনার সঙ্গে দেশীয় কতিপয় স্বর্ণ ব্যবসায়ীর সঙ্গে কোনোভাবে সংযোগ ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। শুল্ক গোয়েন্দার পর্যবেক্ষণমতে, চোরাচালানের একটা বড় অংশ পাচার হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, চোরাচালানকৃত স্বর্ণের অন্য আরেকটা উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে নানা ধরনের অপরাধে অর্থায়নের বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে। এর মূল কারণ হলো স্বর্ণ কাগজের মুদ্রার চেয়ে অধিকতর কম জায়গা দখল করে এবং তা লুকানো ও বহন করা সহজতর। এটি ‘গ্লোবাল কারেন্সি’ হিসেবেও বিবেচিত এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।

অন্যদিকে স্বর্ণের একটা বড় বৈধ বাজারও রয়েছে। দেশের ভেতরে স্বর্ণ দিয়ে গয়না তৈরির বিশাল স্বর্ণের ব্যবসা রয়েছে, যাদের অধিকাংশ
ভ্যাট ও কর প্রদান করে। টিআইবি বলছে, প্রতিবছর দেশের চাহিদা প্রায় ২০ থেকে ৪০ মেট্রিক টন স্বর্ণ। এর মাত্র ১০ ভাগ চাহিদা ট্রেজারি স্বর্ণের মাধ্যমে
পূরণ হয়। এই তথ্য নির্দেশ করছে, দেশের এত বড় শিল্পের মূল উপাদান স্বর্ণের বৈধ সরবরাহে সংকট চলছে। এতে সরকার যথাযথ শুল্ক-কর থেকে
বঞ্চিত হচ্ছে।

প্রশ্ন হতে পারে, সম্প্রতি জারি করা নীতিমালা কি স্বর্ণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের সংকট দূর করতে পারবে?

নীতিমালাটিতে অনেক ইতিবাচক বিষয় স্থান পেয়েছে। প্রথমত, স্বর্ণকারদের স্বর্ণপ্রাপ্তিতে সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। আগের বিধানে কেউ উৎসাহিত না হওয়ায় এই নীতিমালায় আমদানির সুযোগ আরও সৃষ্টি করা হয়েছে। এখন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ডিলার বা কোনো ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে স্বর্ণকারদের চাহিদা মোতাবেক স্বর্ণ আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব ডিলার বিনা শুল্কে স্বর্ণ আনবে এবং তাদের এ জন্য বন্ডের লাইসেন্স প্রদান করা হবে। ভ্যাটে নিবন্ধিত স্বর্ণকারেরা নির্ধারিত ফরম পূরণ করে এবং শুল্ক-কর দিয়ে বন্ডারের কাছ থেকে স্বর্ণ ক্রয় করতে পারবেন।

দ্বিতীয়ত, দেশীয় বাজারের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, রপ্তানিতে ইচ্ছুক ব্যবসায়ীদের বিনা শুল্কে স্বর্ণের ব্যবহার অথবা শুল্ক প্রত্যর্পণের আওতায় সুবিধাদি প্রদান করতে হবে। তাঁদের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

তৃতীয়ত, সরকারের জন্য শুল্ক-করাদি আদায়ও সহজতর করা হয়েছে। স্বর্ণ ব্যবসায় লেনদেনকৃত হাজার হাজার কোটি টাকার কর জালের আওতায় চলে আসবে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কী পরিমাণ স্বর্ণ কিনছেন, গয়না তৈরি করছেন এবং অবশিষ্ট কী পরিমাণ মজুত থাকছে—তার সুনির্দিষ্ট হিসাব সংরক্ষণপদ্ধতি অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে এই নীতিমালায়। এ কারণে এই ব্যবসা এনবিআরের আরও নজরদারির মধ্যে থাকবে এবং প্রযোজ্য শুল্ক-করাদি আহরণ নিশ্চিত হবে।

চতুর্থত, নীতিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভোক্তার স্বার্থের দিকে খেয়াল রাখা। একজন ক্রেতা তাঁর কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে যে গয়না কিনছেন, তার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চয়তা পাওয়া তাঁর অধিকার। নীতিমালায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরীক্ষিত প্রতিটি স্বর্ণালংকার বিক্রি করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। প্রতিটি স্বর্ণালংকারে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্দিষ্ট হলোগ্রামযুক্ত ও যথাযথ চালান প্রদান করে লেনদেন করতে হবে। এ-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে ভোক্তা অধিকার আইন অনুসারে তা নিষ্পত্তি করা হবে।

মোটকথা, স্বর্ণনীতিমালা প্রণয়নে দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হওয়ায় এখন স্বর্ণ ব্যবসায় স্বস্তি ফিরে আসাটা স্বাভাবিক। কেউ এখন অযথা সন্দেহের তির ছুড়তে পারবে না এই ব্যবসার দিকে।