বিরোধী দলের চেয়ে দলের বিরোধীরা বিপজ্জনক

দল

সুষ্ঠুই হোক বা অসুষ্ঠুই হোক, কোনো নির্বাচনের পর সংসদ সদস্য হিসেবে এবং তারপর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পর তাঁদের ওপর গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়। সংবিধান অনুযায়ী বলতে হয়, ‘আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন-অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।’ নির্বাচন–পরবর্তী বিজয় সমাবেশে শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, ‘দায়িত্ব যখন নিয়েছি, সরকার গঠন করেছি, দলমত–নির্বিশেষে সবার জন্যই আমাদের সরকার কাজ করে যাবে।

সেখানে কোনো দলমত দেখা হবে না। দেশের প্রতিটি নাগরিক আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সবার সেবা করবে সরকার। যাঁরা ভোট দিয়েছেন অথবা দেননি, তাঁদের সবার জন্যই কাজ করবে সরকার।’

একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের সেটাই প্রত্যাশা। রাষ্ট্রে প্রত্যেকটি মানুষ তার ধর্ম-বর্ণ–দল-মত–পরিচয়নির্বিশেষে সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য সরকারের আশ্রয় যদি না পায়, তা হলে তারা যাবে কোথায়?

এক নির্জনতাপ্রিয় কবি বলেছেন, কবিতা অনেক রকম। শুধু কবিতা নয়, জগতে অনেক কিছুই অনেক রকম। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও নির্বাচন অনেক রকম। এমনকি একই দেশে একেক সময় একেক রকম। কোনো নির্বাচনে কোনো কেন্দ্রে যদি ভোটারের চেয়ে ভোট বেশি পড়ে, সেটাকেও মানুষ নির্বাচন নামেই অভিহিত করে। যেমন পানি মেশানো দুধও দুধই। তাতে দুধের পরিমাণ যত কম হোক এবং পানির ভাগ যত বেশিই হোক। গত শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মহাসচিব এক সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক সংযত ভাষায় বলেন, এটা স্পষ্ট যে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন পারফেক্ট বা ত্রুটিমুক্ত ছিল না। অন্যান্য খ্যাতিসম্পন্ন বিদেশি সংস্থাও সুখকর মন্তব্য করেনি। পরাজিত দলগুলোর নির্বাচনের সমালোচনা করা স্বাভাবিক। তাতে বিশেষ কিছু আসে যায় না, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কী ধারণা, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

গত নির্বাচনে দেশের বড় ও মাঝারি বহু দল নানা নাটকীয়তার পরেও দলীয় সরকারের অধীনে অংশগ্রহণ করেছে। সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তা সত্ত্বেও নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ আছে কি না। কোনো বউভাতের অনুষ্ঠানের ভোজে সব অতিথিই খেতে বসল। কেউ খেল নান, কাবাব, বিরিয়ানি, মুরগির মোসাল্লাম, শাহি জর্দা, আর কারও পাতে জুটল কয়েক টুকরা শসা, টমেটো ও পেঁয়াজ। ওগুলো খেয়ে মুখ মুছতে মুছতে বাড়িতে গিয়ে বলল, ‘খেয়ে এলাম।’ ও খাওয়া ঠিক খাওয়ার মধ্যে পড়ে না। গত নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীদের অবস্থা সে রকম। তাঁরা অংশগ্রহণ করেছেন, কিন্তু প্রাপ্তিযোগ ঘটেনি। অতীতে যাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন, এখন বিরোধী দলে, তাঁরা বহু ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছেন। তাঁদের ওপর জনগণের আস্থা আছে, সেটা মনে করার কারণ নেই। আত্মসমালোচনার মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করেননি। তাঁরা তাঁদের পাপের ফল ভোগ করছেন। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভালোমন্দ সবাই জনসমর্থন পরীক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে। তা থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যায় না।

উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে ক্ষমতাসীন দল অর্ধেকের বেশি আসনে বিজয় নিশ্চিত করে যদি শ খানেক বা তার কিছু কম আসন সব বিরোধী দলকে দান করত, তা হলে বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়ক থেকে গণতন্ত্রের সড়কে অনেক দূর এগিয়ে যেত। তাতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতো সরকারি দল। তখন বিরোধী দলগুলোর কোনো অভিযোগই ধোপে টিকত না। আন্তর্জাতিক মহলের আমাদের প্রশংসা না করে উপায় থাকত না। গণতান্ত্রিক দেশের ফর্দ থেকে বাংলাদেশের নাম কাটা যাওয়া খুব বড় অসম্মান। যদিও বাংলাদেশে গণতন্ত্র থাকল কি থাকল না, তাতে দুনিয়ার কারও কিছু আসে যায় না।

অযোগ্য বিরোধী দলকে নির্মূল করার মধ্যে একটা নির্মল আনন্দ থাকতে পারে, কিন্তু নিজেদের দলের ভেতরের বিরোধীদের থেকে বিপদ আসার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিরোধী দলের নেতাদের চেনা যায় তাঁদের সমালোচনামূলক কথাবার্তা থেকে, দলের ভেতরের মৌন শত্রুদের শনাক্ত করা কঠিন। তারা ঘাসের ভেতরে সবুজ সাপের মতো। এবারের নির্বাচনে অক্লেশে পাড়ি দেওয়ার একটা মওকা থাকায় আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন অনেকে। তাঁদের অনেকে দলের প্রতি নিবেদিত এবং যোগ্য। তাঁদের বাদ দিয়ে অজ্ঞাত কারণে অনেক আনকোরা মনোনয়ন পেয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। দশ বছরেও দলের অনেকের আশ মেটেনি। তাঁরা অসন্তুষ্ট। ভেতরে চাপা ক্ষোভ।

অতীতে রেকর্ড ঘাঁটলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের ক্ষতি বিরোধী দল কখনো করতে পারেনি, দলের ভেতর থেকেই হয়েছে। সেটা হয়েছে ১৯৫৪-৫৫ সালে, সেটা হয়েছে ১৯৭৪-৭৫ সালে, সেটা হয়েছে ২০০৬-০৭ সালে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত নয় অথচ শেখ হাসিনার সরকারের অমঙ্গল চান না, তাঁরা সরকারি দলের নেতাদের কথাবার্তা ও কাজকারবারে বিপন্ন বোধ করছেন। বিজয়ীদের থেকে মানুষ সংযত আচরণ আশা করে। প্রতিপক্ষকে সমালোচনা করা এক কথা আর অপদস্থ করা আরেক জিনিস। সংসদে বিরোধী দল না থাকলে না–ই থাক, কিন্তু একটা পাতানো বিরোধী দল খাড়া করার দরকার কী? আমাদের কর্মকাণ্ডে ও কথাবার্তায় বিদেশিরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়বে কেন?

একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশে শাসনকাজ পরিচালনা সহজ নয়। জায়গা কম, মানুষ বেশি। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। বসে বসে খেলা দেখে তাদের দিন কাটবে না। তারা কাজ চায়। কাজ বলতে শুধু সরকারি চাকরি নয়। স্থায়িত্বশীল প্রাইভেট সেক্টর বিকশিত হলে সেখানে তারা কাজ পেতে পারে। তা না হলে কথিত ‘প্রথমবারের ভোটারদের’ কোনো ভবিষ্যৎ নেই। হতাশাগ্রস্ত মানুষদের থেকে শুভবুদ্ধি আশা করা যায় না। অনেকের মধ্যে উগ্রতা দেখা দিতে পারে, তাতে সমাজ অশান্ত হতে পারে। তা সরকার ও জনগণের জন্য মঙ্গলজনক নয়।

সবকিছু নির্বিঘ্নে হয়ে যাচ্ছে বলে যতই প্রতীয়মান হোক, প্রকৃতপক্ষে পরিস্থিতি অস্পষ্ট। এ অবস্থায় তাৎক্ষণিকতাপ্রসূত নয়, সুস্থির মাথার সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। বাংলাদেশ টানটান দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছে। পা ফসকে একটু এদিক–ওদিক হলেই সর্বনাশ।